আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে

Latest News:

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৫

ঘন্টু মামা (পর্ব-৩)

রিসিপশনের মেয়েটি খটমট করে আমাদের দিকে তাঁকাচ্ছে। মেয়েটির চাহনীতে স্পষ্টত বিরক্তি। কিন্তু ঘন্টু মামার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি পা নাড়ানো ও পান চিবুনো দুটোই সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি ঈশারা করেও তাঁকে থামাতে পারিনি। অনেকক্ষণ পান চিবোনোর পর এদিক-ওদিক তাঁকিয়ে বললেন, ধুস! এতো বড় অফিস, সব আছে অথচ পানের পিক ফেলার কিছু নেই! মানুষগুলোর কমনসেন্স নেই বললেই চলে!

আমি ফিসফিস করে বললাম, কমনসেন্স তো নেই তোমার। এতো বড় অফিসে এসে কেউ এভাবে জাবর কাটে! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেলোনা। ওপাশে বোধহয় ওয়াশরুম আছে। যাও পিক ফেলে মুখ ধুয়ে এসো।

ঘন্টু মামা উৎসাহ নিয়ে বললেন, কী যে বলিস! পিক ফেললে পানের মজা আছে?

আমি রেগে বললাম, “তাহলে আর কী করবে! গিলেই ফেলো।”

রিসিপশনের মেয়েটি ঠোঁটে কাঠহাসি ফুটিয়ে ভেতরে যাওয়ার ইঙ্গিত করতেই আমরা উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই ঘটলো বিপত্তি। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে ঘন্টু মামার পা লেগে একটা বড় ফ্লাওয়ার ভাস মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেলো। ভাঙ্গার শব্দে পাশের রুম থেকে দু-জন ছুটে এলো। আমি আর ঘন্টু মামা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘন্টু মামা আমতা আমতা করে বললেন, স্যরি। আমি দেখতে পাইনি।

একজন মোটামতো লোক ঘন্টু মামার দিকে বিকটভাবে তাঁকিয়ে বলল, ইটস ওকে। কোথায় যাচ্ছিলেন, যান।

বিশাল রুম। চারদিকে দামী দামী আসবাব ছড়িয়ে আছে। সবগুলো জিনিসই চকচক করছে। একপাশের দেয়ালে বড় একটা পেইন্টিং। মেঝে এতোটাই স্বচ্ছ যে একটা ছোট্ট সুঁচ পড়লেও অনায়াসে খুঁজে পাওয়া যাবে। একটা বড় চেয়ারে একজন সুদর্শন লোক বসে আছেন। লোকটির বয়স বড়জোর পঁয়ত্রিশের কোটায়। কিন্তু এর মধ্যেই যে তিনি নিজেকে ঘুচিয়ে নিয়ে ভালো একটা অবস্থানে আছেন তা উনাকে দেখেই অনুমান করা যায়। তিনি ঘন্টু মামার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, কী ব্যাপার ঘনাচরন বাবু? অনেকদিন পর দেখছি। হঠাত কী মনে করে বলুন তো?
ঘন্টু মামা একগাল হেসে বললেন, আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। তাই চলে এলাম।

লোকটি বললেন, আপনি মশাই নিজের স্বার্থ ছাড়া কোনদিকে এক পা বাড়ান না। এবার কীসে স্পন্সর করতে হবে! বলে ফেলুন চট করে।

ঘন্টু মামা হেসে বললেন, এজন্যই আপনাকে আমার এতো পছন্দ।

লোকটি বললেন, পছন্দ করে কী করবেন! আমার বারোটা বাজানোই তো আপনার কাজ। এইতো এসেই এতো দামী একটা ফ্লাওয়ার ভাস ভেঙ্গে ফেললেন! আচ্ছা বলুন তো আপনি এতো দুর্ঘটনা প্রবন কেন?

ঘন্টু মামা লজ্জ্বিত হয়ে বললেন, কী করবো বলুন। ইচ্ছে করে তো দুর্ঘটনা ঘটাতে চাইনা। তো যে কাজে এসেছিলাম....

লোকটি ঘন্টু মামাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এসব কাজ-টাজ পরে হবে। আগের বারের কথা আমি ভুলিনি। আমি এখন খুব ব্যস্ত। চা দিতে বলছি, খেয়ে বিদেয় হোন।

লোকটির কথায় আমি অপমানিতবোধ করছি। ঘন্টু মামার মুখ দেখে কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছেনা। তিনি মুখে হাসি ঝুলিয়েই বললেন, কী যে বলেন! এক কাপ চা খাওয়ার জন্য এতো টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে এখানে এসেছি নাকি! মান্নানের পাঁচ টাকা দামের চায়ের চেয়ে ভালো চা কী আপনার এখানে বানায়?

লোকটি বললেন, বাজে কথা রাখুন। আপনার কোন কাজে আসতে পারলাম না বলে দুঃখিত। প্লীজ আসুন।

ঘন্টু মামা রহস্যের হাসি হেসে বললেন, যেতে বললে আর কী যাওয়া যায়! আমার হাতে আপনাকে বধ করার একটা গোপন অস্ত্র আছে নিশ্চয় ভুলে যাননি?

লোকটিকে খানিকটা অপ্রস্তুত দেখালো তবে যথাসমভব গাম্ভীর্য্য বজায় রেখে বললেন, এই একটা ইস্যু নিয়ে আর কতোকাল ব্ল্যাকমেইল করবেন। এবার নতুন কিছু ভাবুন। এসব আমার কোন মাথাব্যাথা নেই।

ঘন্টু মামা মাথা চুলকে বললেন, ঠিক বলছেন তো?

লোকটি বললেন, সবকিছুর লিমিট আছে। আপনি নিজের সীমা অতিক্রম করছেন। আমি আপনার কোন বিষয়ে স্পন্সর করতে পারবোনা। গতবার আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। টাকা গাছে ধরেনা। অনেক কষ্ট করে রোজগার করতে হয়।

ঘন্টু মামা বললেন, কী করবো বলুন! গতবার কমিটির মধ্যেই একটা গন্ডগোল ছিল। এবার কোন সমস্যা হবেনা। আপনার প্রচারনা ঠিকমতো হবে।

লোকটি বললেন, আমার কোন প্রচারনা চাইনা। দয়া করে আপনি আসুন।

ঘন্টু মামা উঠে দাঁড়ালেন। দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার পেছন ফিরলেন। লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, সত্যি যাচ্ছি।

লোকটি ঘন্টু মামার কথাকে কোন পাত্তা না দিয়ে ফাইলে মনোযোগ দিলেন। ঘন্টু মামা আর আমি বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে আসার সময় রিসিপশনের মেয়েটি এমনভাবে আমাদের দিকে তাঁকাচ্ছিল যেন পারলে গিলে খায় আর কি!

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমি ঘন্টু মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ কী গো! তুমি যে লোকটাকে রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করছিলে? কী ব্যাপার বলো তো?

ঘন্টু মামা হেসে বললেন, সে অনেক কাহিনী। তোর জেনে কাজ নেই।

আমি বললাম, কিন্তু লোকটি তো কোন স্পন্সর করবেনা। এখন কী করবে? হাতে খুব একটা সময় নেই। শীঘ্রই টিম এন্ট্রি করতে হবে।

ঘন্টু মামা আবার রহস্যের হাসি হেসে বললেন, চিন্তা করিস না। কালকের মধ্যে দেখিস ঠিকই যোগাযোগ করবে। শোন, এদিকে কোন একটা দোকানে খুব ভালো বিরিয়ানী বিক্রি করেনা? এদিকে যখন এসেছি বিরিয়ানীটা খেয়েই যাই।

এই একটা ব্যাপারে ঘন্টু মামার কোন ক্লান্তি নেই। একটু আগেই যে পরিমাণ অপমানিত হয়ে এসেছেন তারপরও একজন মানুষ এতো নির্দ্বিধায় খাওয়ার কথা বলে কীভাবে! অপমান গিলে আমার পেট এমনিতেই ভরে গেছে তবুও ঘন্টু মামার পেছনে আমাকেও ছুটতে হলো।

ঘন্টু মামা (পর্ব-২)



ঘন্টু মামার বাসাটা আমাদের পাড়ার একেবারে মধ্যিখানে। একতলা এই বাসাটি ঘন্টু মামার বাবা তৈরি করেছিলেন। অনেক শখ করে তৈরি করলেও ঘন্টু মামার বাবা এ বাসায় একটি দিনও থাকতে পারেননি। ঘর সঞ্চয় করে যেদিন বাসায় উঠবেন, ঠিক আগের দিন রাতে হার্ট এটাক করে তিনি মারা যান। এই বাসা তৈরি করার আগে ঘন্টু মামারা এ পাড়াতেই একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্বামীর শখের বাসায় স্বামী থাকতে পারেননি সেই শোকে ঘন্টু মামার মাও এ বাড়িতে উঠলেন না। পাঁচ কক্ষের বাসাটি ভাড়া দিয়ে ঘন্টু মামার মা গ্রামের বাড়িতে চলে গেলেন। ঘন্টু মামা তখন অনেক ছোট। তিনিও মায়ের সাথে গ্রামের বাড়িতে ছুটলেন। কয়েক বছর গ্রামে থেকে ঘন্টু মামা তার কাকার সাথে আবার এই বাড়িতে এসে উঠলেন। তিনি ও তার কাকা বাইরের দিকে একটা ঘরে থাকা শুরু করলেন। বাকি ঘরগুলো ভাড়াই থাকলো।

ঘন্টু মামার কাকা পড়ুয়া মানুষ। তিনি সবসময় তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ঘন্টু মামাকে তিনি ক্লাস সিক্সে ভর্তি করিয়ে দিলেন বটে কিন্তু ভাইপোর দিকে নজর দেয়ার মতো এতো সময় তার কোথায়! আর এই সুযোগে ঘন্টু মামা দিনকে দিন বেয়াড়া হয়ে উঠলেন। পড়াশোনা সব শিকেয় উঠলো। কোনরকমে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছেন। বিএ তে ভর্তিও হয়েছিলেন কিন্তু সেটা চালিয়ে যাওয়ার মতো ইচ্ছা ও মানসিকতা কোনটাই ঘন্টু মামার ছিলোনা। ঘন্টু মামার কাকা নরেন পিএইচডি করার জন্য কানাডা পাড়ি জমালে ঘন্টু মামা চূড়ান্ত স্বাধীনতা পেয়ে যান।

ঘন্টু মামার মা তার মেধাবী দেবরের সাথে ঘন্টু মামাকে শহরে পাঠিয়েছিলেন এই ভেবে যে, পড়ুয়া কাকার সংস্পর্শে থেকে ঘন্টু মামাও পড়াশোনাটা ঠিকমতো চালিয়ে যাবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি! ঘন্টু মামার মা আপাতত অদৃষ্টকে দোষ দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন।

ঘন্টু মামার কাকার অনুপস্থিতিতে ঘন্টু মামার রুমটাকেই আমরা আমাদের ক্লাব ঘর বানিয়ে নিয়েছি। আসলে ক্লাব বলতে যা বোঝায় এটি সেরকম না। এখানে কোন প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারীর বালাই নেই। এটা আমাদের রাজত্ব, এখানে আমরা সবাই রাজা। তবে এটা মানতেই হবে আমাদের এই রাজত্বে ঘন্টু মামাই মূল কান্ডারী তবে কোনভাবেই তাঁকে স্বৈরাচারী বলা চলেনা। ঘন্টু মামা অনেকটা আমাদের গাইডের মতো।

আজ সন্ধ্যায় ঘন্টু মামা ক্লাবঘরে অর্থাৎ তার রুমে আমাদের সবাইকে ডেকেছেন। সচরাচর এভাবে আয়োজন করে সবাইকে ডাকা হয়না। তাই আমি অনুমান করছি কোন বিশেষ কারনে ঘন্টু মামা আমাদের আজ ডেকেছেন।

আমি আর রিজু গেট দিয়ে ঢুকতে যাবো তখন ঘন্টু মামা হাঁক দিলেন, এই মুন্না তুই এদিকে আয়। আর রিজু মান্নানের দোকানে চপের অর্ডার দেয়া আছে তুই সেগুলো নিয়ে আয়। মনে করে সঙ্গে ভাঁজা শুকনো মরিচ আনিস কিন্তু।

আমি ঘন্টু মামার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, কি ব্যাপার! সবাইকে এতো জরুরী তলব করেছো কেন?

ঘন্টু মামা রহস্যের হাসি হেসে বললেন, সবাই আসুক। জানতে পারবি।

আমার আর তর সইছিলোনা। বললাম, বলোইনা।

“আরে এতো উতলা হচ্ছিস কেন? এক কাজ কর তুই চেয়ারগুলোকে ঠিকঠাক করে রাখ। আমি ছাদ থেকে আসছি।”

ঘন্টু মামা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বসে আছে। ঘরজুড়ে পীনপতন নীরবতা। ঘন্টু মামাকে ঘিরে আমরা ছয়জন বসে আছি। সবাই অপেক্ষা করে আছি ঘন্টু মামার বক্তব্য শোনার জন্য। ঘন্টু মামা কথা বলতে যাবেন এমন সময় হাসু বলে উঠলো, চপগুলো টেবিলের ওপর থেকে সরিয়ে রাখা হোক। বারবার চপের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে।
হাসুর কথা শুনে ঘরজুড়ে হাসির রোল উঠলো। ঘন্টু মামার সিরিয়াস ভঙ্গিতেও ছেদ পড়লো। তিনি বললেন, আপনি এতো রাক্ষস কেন! নিজের লোভকে সামলে রাখতে পারেন না? সামনে খাবার থাকলেই লোভ করতে হবে নাকি!

ঘন্টু মামা হাসুকে আপনি করে সম্বোধন করছেন দেখে আমরা সবাই ভীষন আশ্চর্য্য হলাম। রিজু জিজ্ঞেস করলো, কি গো মামা! তুমি ওকে আপনি করে বলছো কেন!

“এখানে একটা সভা চলছে। সভার নিয়ম অনুসারে সবাইকে আপনি করে বলতে হয়। কাজেই সভা চলাকালীন তুমি-তুই এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা চলবেনা। সবাই সবাইকে সম্মান প্রদর্শন করে কথা বলতে হবে।”

আমরা মাথা নাড়লাম। তবে ব্যাপারটা বেশ মজা লাগলো। ঘন্টু মামার অগোচরে একে-অপরকে চিমটি কাটতে লাগলাম। ঘন্টু মামা গলা খাকারি দিয়ে বললেন, তাহলে সভা শুরু করা যাক।

আমরা সবাই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম। ঘন্টু মামা বলতে শুরু করলেন, আজ আমরা এখানে একটা বিশেষ কারনে মিলিত হয়েছি।

সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাঁকিয়ে রইলাম। ঘন্টু মামা ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে বললেন, আমি যতোটুকু জানি আপনাদের কারো এখন কোন পরীক্ষা বা অন্য কোন কাজ নেই। অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম এই সময়টা এভাবে অলস বসে না থেকে আমরা কিছু একটা করতে পারি।

আমি বললাম, কী করা যায়?

ঘন্টু মামা বললেন, কী করা যায় আপনারা ভেবে বের করুন।

এবার সবার মধ্যে গুনগুন শুরু হলো। খানিক পরে রিজু বলল, আমরা কোথাও ঘুরে আসতে পারি?

ঘন্টু মামা বললেন, ঘুরাঘুরি আমরা অনেক করেছি। আপাতত ঘুরাঘুরি বাদ। অন্য কিছু চিন্তা করুন।

অনেক আলোচনা করেও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছিলোনা। আমি এমনিতেই বললাম, আগামী মাস থেকে কাউন্সিলর কাপ সিক্স এ সাইড ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হতে যাচ্ছে আমরা তাতে অংশ নিতে পারি।

কথাটা ঘন্টু মামার মনে ধরলো। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। সবাই কি বলেন?

সাধারণত কেউ ঘন্টু মামার সিদ্ধান্তের বাইরে যায়না। কিন্তু এবার রিজু বলল, প্রস্তাবটা মন্দ নয় তবে কথা হচ্ছে আমাদের তো ভালো ব্যাট-বলই নেই খেলবো কীভাবে?

রিজুর কথার সাথে সবাই একমত। আসলেই আমাদের ভালো ব্যাট-বল নেই। হাসু বলল, আমরা সবাই চাঁদা দিয়ে ব্যাট-বল কিনতে পারি।

আমি বললাম, চাঁদা দিয়ে ব্যাট-বল হয়তো কেনা যাবে কিন্তু একটা টুর্নামেন্টে অংশ নিতে হলে এন্ট্রি ফিসহ অনেক প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। আমরা মাত্র কয়েকজন চাঁদা দিয়ে কীভাবে কী হবে? ঘন্টু মামা কী বলো?

“হু আমিও তোর কথার সাথে একমত। তুই খোঁজ নে টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি কতো? আর প্রাইজমানিটা কেমন সেটাও খবর নিস।”

“শুনেছি প্রাইজমানিটা বেশ ভালোই। ইন্ডিভিচুয়ালী ম্যাচ ফির পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ান টিমকে একটা ফ্ল্যাট টিভি পুরস্কার দেবে।”

ঘন্টু মামা চোখ কপালে তুলে বলল, বলিস কীরে! খুব বড় স্পন্সরকে বাগিয়েছে মনে হচ্ছে! অংশ নিতে পারলে ভালোই হতো। ক্লাবের জন্য একটা টিভির ব্যবস্থা হয়ে যেতো।

সবাই ঘন্টু মামার কথায় সায় দিলাম। হাসু বলল, সবই তো বুঝলাম কিন্তু টাকা-পয়সা কীভাবে ম্যানেজ হবে?

ঘন্টু মামা বললেন, এতো চিন্তা করার কী আছে! তোর আইফোনটা বিক্রি করে দিলেই তো মোটা অংকের টাকা পাবো।
হাসু ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো সে কিছু বলতে যাচ্ছিলো পাশ থেকে আলম টিপ্পনী কেটে বললো, এভাবে হাতে হাতে বিক্রি করলে বেশী টাকা পাওয়া যাবেনা।

রিজু বললো, সমস্যা কী! এখন তো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবহৃত জিনিস বিক্রি করা যায়। ওখানে অনেক ক্রেতা পাওয়া যায়। দামও বেশ ভালোই পাওয়া যায়।

হাসু অনেকক্ষন পর সুযোগ পেয়ে বলল, মোটেও আমি আমার আইফোন বিক্রি করবোনা। আমার মামা লন্ডন থেকে এটা পাঠিয়েছে।

আমি ব্যঙ্গ করে বললাম, ছি ছি হাসু! তুই আমাদের জন্য এই ছোট্ট সেক্রিফাইসটা করতে পারবি না!

হাসু মুখ কালো করেই জবাব দিল, তোর ট্যাবটাই বিক্রি করে দেসনা। ওটা বিক্রি করলেও ভালো টাকা পাওয়া যাবে।

ঘন্টু মামা এতোক্ষন চুপচাপ মজা দেখছিল। পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে দেখে তিনি বললেন, কী শুরু করলি তোরা। আমি থাকতে তোদের চিন্তার কী আছে! তোদের কিচ্ছু বিক্রি করার দরকার নেই।

আমি বললাম, সে তো ঠিক আছে। কিন্তু গতবারের ফাংশানের কথা নিশ্চয় মনে আছে! এরপরও সহজে স্পন্সর পাবে বলে মনে করছো?

ঘন্টু মামা চিন্তিত মুখে বললেন, সেটা খানিকটা দুশ্চিন্তার বিষয়। তবে যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলবো। আর যদি ম্যানেজ নাই করা যায় তাহলে বিকল্প ভাবনা ভেবে রেখেছি।

সবাই উৎসুক হয়ে একসাথে জিজ্ঞেস করলাম, কী ভাবনা?

ঘন্টু মামা বললেন, সবগুলা একসাথে কথা বলছিস কেন! যদি কোনভাবেই স্পন্সর যোগাড় না হয় তবে সেগুন গাছটা কেটে ফেলবো।

সেগুন গাছ কাটার কথা শুনেই আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম। শুধু ঘন্টু মামার সাথেই নয়, এ পাড়ার সাথেই সেগুন গাছটির একটি আত্মিক বন্ধন হয়ে গেছে। ঘন্টু মামার বাবা এই বাসা তৈরির সময় সামনের উঠোনে গাছটি লাগিয়েছিলেন। আজ গাছটি একটি মহীরূহ হয়ে পুরো বাড়িটাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, পাগল হয়েছো নাকি! মাত্র ক’টা টাকার জন্য এতো বড় গাছ কাটবে? দরকার নেই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার।

আমার কথায় সবাই সায় দিলো। রিজু বলল, এই সেগুন গাছের দাম কতো হবে জানো? কয়েক লাখ টাকা হবে। এটা কাটা হবে চূড়ান্ত বোকামী।

ঘন্টু মামা বললেন, আমি এখনই কাটবো বলছিনা। যদি টাকার ব্যবস্থা না হয় তখনই এটা কাটা যায় কিনা দেখবো। এছাড়া আমার কিছু দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা আছে। এজন্য অনেক টাকার দরকার।

আমি বললাম, পরিকল্পনাটা কী জানতে পারি?

ঘন্টু মামা বললেন, অনেক প্ল্যান করে রেখেছি। এছাড়া ক্লাবঘরের জন্য কিছু চেয়ার-টেবিল-আলমিরা বানাতে হবে। সেগুন গাছের কাঠ দিয়েই যদি তা করা যায় মন্দ কী! দক্ষ কাঠমিস্ত্রী দিয়ে আমরা কয়েকটা ভালো ব্যাট বানিয়ে নিতে পারি। এতে করে সারা বছর সবাই প্র্যাকটিসের মধ্যে থাকতে পারবে। এখন সবাই মনে মনে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করো।

ঘন্টু মামা (পর্ব-১)

আমার মায়ের সাথে কোন প্রকার আত্মীয়তার সম্পর্ক না থেকেও তিনি আমার মামা। কবে, কীভাবে যে তিনি আমার মামা হয়ে গিয়েছিলেন তা আমি নিজেও জানিনা।! আমার দেখাদেখি আমার সমবয়সীরাও তাঁকে মামা বলে ডাকা শুরু করেছিল। সেই থেকে তিনি আমাদের সবার প্রিয় ঘন্টু মামা।

ঘন্টু মামার ভালো নাম ঘনাচরণ সরকার। তবে খুব কমসংখ্যক লোকই তাঁকে এ নামে চেনে। সবার কাছে তিনি ঘন্টু নামেই বেশী পরিচিত। ঘন্টু মামা মানুষটা খুব মজার তবে অসম্ভব রকমের নরম মনের মানুষ। অন্যের দুঃখ-কষ্ট তিনি একদম সইতে পারেননা। পাড়ার গরীব অসহায় মানুষের এক অন্যতম ভরসার নাম ঘন্টু মামা। নিজে না খেয়ে হলেও তিনি অন্যের খাদ্যের ব্যবস্থা করতে মরীয়া হয়ে উঠেন।

ঘন্টু মামার আরেকটা গুণ হচ্ছে তিনি খুব সহজে মানুষের সাথে মিশতে পারেন। একেবারে অপরিচিত মানুষের সাথেও তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। ঘন্টু মামার সাথে রাস্তায় বেরোলেই বোঝা যায় তিনি কতোটা পরিচিত! তার পরিচিতির ঠেলায় পাঁচ মিনিটের রাস্তা পেরুতে বিশ মিনিট লেগে যায়। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলি ইলেকশানে তোমাকে দাঁড় করিয়ে দিলে তুমি অনায়াসেই পাশ করে যাবে!

এলাকার মেয়ে মহলে ঘন্টু মামার আলাদা একটা কদর আছে। কতো যুগলের প্রেম-বিরহের গল্প রচিত হয়েছে ঘন্টু মামার হাত দিয়েই। পাড়ার উঠতি ছেলেরা ঘন্টু মামা বলতেই অজ্ঞান। ঘন্টু মামাকে বাদ দিয়ে পাড়ার কোন ধরনের খেলাধুলা বা ফাংশনের কথা চিন্তাই করা যায়না। খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্পন্সর যোগাড় করা সহ সব আয়োজনের অগ্রসৈনিক আমাদের প্রিয় ঘন্টু মামা।

জয়াদির সাথে ঘন্টু মামার এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক আছে। আমি আর আমাদের কাছের কয়েকজন ছাড়া এ বিষয়ে কেউ একটা জানেনা। ঘন্টু মামাও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাতে আগ্রহী না। ঘনাচরণ সরকার ওরফে ঘন্টু মামাকে আমি যেহেতু মামা বলে ডাকি সেহেতু উনার প্রেমিকাকে আমার মামী বলে সম্বোধন করা উচিত। কিন্তু এখানে ছোট্ট একটা গন্ডগোল আছে। গন্ডগোলটা বাঁধিয়েছেন ঘন্টু মামা স্বয়ং। আমার পাড়াতুতো সুন্দরী দিদির সাথে ঘন্টু মামা প্রেম করলে আমার কী করার আছে! জয়াদিকে ছোটবেলা থেকেই দিদি ডেকে অভ্যস্ত; এখন হঠাত করে মামী বলে ডাকি কেমন করে?

ঘন্টু মামা আর আমি হরিহর আত্মা। ঘন্টু মামা যেখানে আমি আছি সেখানে। আর যেহেতু আমি সবসময় উনার সাথে ছায়ার মতো সেঁটে আছি কাজেই ঘন্টু মামার অনেক অজানা কাহিনীরও প্রত্যক্ষদর্শী আমি।

অনেকদিন থেকেই আঁচ করছিলাম জয়াদি আর ঘন্টু মামার মধ্যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রাস্তা বা অন্য কোথাও যখন দুজন একে-অপরের মুখোমুখি হতেন তখন তাদের অঙ্গভঙ্গিই বলে দিতো ডাল ম্যা কুচ কালা হ্যায়! প্রানোচ্ছ্বল, মিশুক আর সদা হাসোজ্জ্বল ঘন্টু মামাকেও দেখতাম কেমন জানি চুপসে যেতেন। জয়াদির সাথে কথা বলতে গেলেই ঘন্টু মামার কথা জড়িয়ে যেতো; জয়াদির মুখোমুখি হলে ঘন্টু মামার কথা শুনে যে কেউ মনে করবে কোনকালে ঘন্টু মামার তোতলানোর অভ্যাস ছিল। জয়াদিকে ঘন্টু মামার মতো এতোটা অপ্রস্তুত না দেখালেও স্পষ্টত বুঝা যেতো উনার মধ্যেও কিছু একটা ঘটছে। তবে জয়াদি তার স্বভাবসুলভ সুন্দর হাসি দিয়ে পুরো পরিস্থিতিটা সামলে নিতেন। এভাবেই অনেকদিন চলছিলো। কেউ আগ বাড়িয়ে মনের কথা খুলে বলতে পারছিলো না।

সে প্রায় বছর দেড়েক আগের কথা। একদিন বিকেলে জয়াদি তার কাকাতো ভাই দেবাকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। জয়াদি আমায় ডেকেছেন শুনে আমি বিষ্মিত হলাম। দেবা নিতান্তই একটা বাচ্চা ছেলে। ওকে কারনটাও জিজ্ঞেস করতে পারছিলাম না। ভাবলাম ঘন্টু মামাকে একটা ফোন দেবো কিনা! পরক্ষণেই মনে হলো গিয়েই দেখি না কি ব্যাপার!

আজকাল জয়াদি খানিক রাগী রাগী হয়ে গেলেও তখন মোটেও রাগী ছিলেন না। তবু আমার কেন জানি ভয় ভয় করছিলো। আসলে অতিরিক্ত সুন্দরী জয়াদির আচরনে এমন একটা গাম্ভীর্য্য ছিল; যে কেউ তাঁকে সমীহ করে চলতে বাধ্য। আমি ভীরু ভীরু পায়ে জয়াদির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। এর আগেও আমি এ বাড়িতে কত্তো এসেছি। কখনো এতোটা ইতঃস্তত লাগেনি।

দরজায় নক করতেই জয়াদি দরজা খুলে দিলেন। ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই দেখলাম ঝর্না কাকীমা টিভিতে কী একটা অনুষ্ঠান দেখছেন। আমাকে দেখে বললেন, আরে মুন্না! তুই কোত্থেকে! আজকাল তো  তোকে দেখাই যায়না! বেশ বড় হয়ে গেছিস দেখছি। তা এবার কোন ক্লাসে উঠলি?

আমি বুক চিতিয়ে জবাব দিলাম, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছি।

কাকীমা অবাক হয়ে বলল, বলিস কীরে! সেদিনও তো দেখতাম তোর মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেতিস। বাব্বা! তোরা সবাই কতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি! কোন কলেজে এডমিশন নিয়েছিস?

আমি উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম। জয়াদি থামিয়ে দিয়ে বলল, মা কি শুরু করেছো? আসার পর থেকেই ওকে জেরা করে চলেছো! এই মুন্না আমার ঘরে চল।

আমি জয়াদির পিছু পিছু জয়াদির রুমে হাজির হলাম। রুমে ঢুকেই আমার বিষ্ময় আকাশ স্পর্শ করলো। পুরো ঘরের দেয়াল পার্পল রঙের ইমালশন রঙ দিয়ে রাঙ্গানো। দরজার বাঁ-পাশে দুটি আলমিরা ভর্তি বই আর বই। এক পলকে চোখ বুলিয়ে দেখলাম নামী-দামী লেখকের বইয়ে আলমিরা ঠাসা। আলমিরার পাশে দেয়ালে সারি করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শেকসপীয়ার, ম্যাক্সিম গোর্কী, বঙ্গবন্ধু, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের ছবি ঠাঙ্গানো।

ডানপাশে একটা হোম থিয়েটার সেট করা হয়েছে। হোম থিয়েটারের পাশেই দুটো সেলফভর্তি হরেক রকম ডিভিডি। ঘরের ঠিক মাঝখানে শুভ্র সাদা চাদর বিছানো একটা খাট। বালিশের উপর আধখোলা ল্যাপটপ। খাটের পাশে টেবিলে ছড়ানো কয়েকটি কাগজের টুকরো। মেঝেজুড়ে বিছানো মখমলের কার্পেট। পুরো ঘরের মধ্যে যেন একটা সুভাষ ছড়ানো। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো আমি কোন স্বর্গালোকে প্রবেশ করেছি। বিষ্মিত হয়ে জয়াদিকে বললাম, এ কী গো! আমার তো মনে হচ্ছে আমি এক ভিন্নজগতে এসে পড়েছি।

জয়াদি মৃদু হাসলো। আমার ঘোর তখনো কাটছেনা। আমি বললাম, এই বইগুলো কী তুমি পড়? এই ডিভিডিগুলোও কি তোমার?

জয়াদি বলে, তোর কি মনে হয়?

আমি বললাম, ঘরটাকে তো পুরো স্বর্গ বানিয়ে রেখেছো।

জয়াদি মৃদু হাসলো। তারপর বলল, তুই বস। আমি তোর জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।

জয়াদি পাশের ঘরে চলে যেতেই আবার বুকে ধুকপুকানি শুরু হলো, জয়াদি কেন আমায় ডেকে পাঠালো!

খানিক পরেই জয়াদি একপ্লেট সন্দেশ আর এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। আমার সামনে প্লেট রেখে বলল, নে খা।
আমি বললাম, পাগল হয়েছো এতো সন্দেশ খাবো কী করে?
যতোটা পারিস খা। বাকিগুলো তোর গুরুদেব ঘনাচরণের জন্য নিয়ে যাস।

সন্দেশগুলো খাঁটি গরুর দুধ থুক্কু গরুর খাঁটি দুধের ক্ষীর দিয়ে তৈরি। বেশ মজা করে তিনটে সন্দেশ খেয়ে নিলাম। প্লেটে পড়ে রইলো আরো তিনটে সন্দেশ। সন্দেশগুলো এতোটাই সুস্বাদু যে ইচ্ছে করছিলো আরো দু-একটা খেতে। তবে ইচ্ছেকে দমন করলাম কেননা বেশী খেলে জয়াদি আবার আমাকে রাক্ষস ভেবে বসতে পারে।

ঢক ঢক করে পানির গ্লাস শেষ করতেই জয়াদি বলল, তোকে আজ একটা কাজে ডেকেছি।

আমি জিজ্ঞাসু চোখে জয়াদির দিকে তাঁকালাম। জয়াদি ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা তোর ঘন্টু মামাকে দিবি।

আমি মনে মনে এরকম কিছুই আন্দাজ করছিলাম। আমি বাধ্য ছেলের মতো কাগজটা বুক পকেটে ভরে উঠে দাঁড়ালাম। জয়াদিকে খানিকটা লজ্জ্বিত দেখাচ্ছে। আমি পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য বললাম, তুমি কোন চিন্তা করোনা। আমি ঠিকঠাক ঘন্টু মামার কাছে পৌছে দেব।

জয়াদি আমাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জয়াদি পেছন থেকে বলল, মুন্না আর কাউকে কাগজটি দেখাস নে আমার লক্ষী ভাই। আমি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে তড়তড় করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম।

জয়াদির বাসা থেকে বেরিয়ে বুঝলাম আমার ছোট্ট পকেটে চিঠিখানা বড্ড ভারী হয়ে গেছে। যার জিনিস তার হাতে পৌছে না দেয়া পর্যন্ত শান্তি পাবোনা। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখন মান্নানের চা স্টলে গেলেই ঘন্টু মামাকে পেয়ে যাবো। তাই সোজা মান্নানের চা স্টলের দিকে রওয়ানা দিলাম।

মান্নানের চা স্টলের কাছাকাছি পৌছতেই মান্নানের স্পেশাল আলুচপের গন্ধ নাকে ভেসে এলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মান্নানের স্পেশাল আলুচপ খাওয়ার জন্য দূর-দূরান্তের মানুষ ভীড় জমায় এ পাড়াতে। এ পাড়ার অনেক রহস্যের মধ্যে মান্নানের স্পেশাল আলুচপ আরো একটা গুরুতর রহস্য। আর দশটা দোকানের প্রচলিত আলুচপ থেকে এর স্বাদ ও আকৃতি সম্পূর্ন ভিন্ন ধরনের। ঘন্টু মামা মান্নানকে পটিয়ে এই স্পেশাল আলু চপ তৈরির কলাকৌশল জানার অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে আশাহত হতে হয়েছে। মান্নান কোনভাবেই তার ব্যবসায়িক রহস্য ফাঁস করতে রাজী নয়। ঘন্টু মামা একবার ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, আমি তোর আলুচপের সেম্পল বিএসটিআই এ পাঠাবো। না জানি কি সব বিষ-টিষ সবাইকে খাওয়াচ্ছিস! পরীক্ষা করে যদি পাওয়া যায় উল্টোপাল্টা কিছু মিশিয়ে আলুচপ তৈরি করিস তাহলে কিন্তু সোজা চৌদ্দ শিকের ভেতরে পাঠাবে। বিয়ে না করেও শ্বশুরবাড়ি দেখে আসবি। তবে কোন প্রকার ভয় দেখিয়েও লাভ হয়নি, মান্নান তার আটাশখানা দাঁত কেলিয়ে সব হুমকি বাতাসে ঊড়িয়ে দিয়েছে।

এখন মান্নানের ব্যবসার পিক আওয়ার। দোকানে মানুষ গিজগিজ করছে। চারটে বেঞ্চের সবগুলোই বহিরাগত মানুষের দখলে। চা স্টলের বাইরের দিকে একটা বেঞ্চে ঘন্টু মামা আর রাজু বসে আছে। ঘন্টু মামার এক হাতে আলু চপ, আরেক হাতে আরেকহাতে চায়ের কাপ। তিনি আলুচপে একটা কামড় বসিয়ে মান্নানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বিষ-টিষ যাই মেশাশ না কেনো রে ভাই, তোর এই আলুচপ না খেয়ে একটা দিনও কাটাতে পারবোনা। ধন্যি তোর মায়ের পেটের।

মান্নান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, চপ তৈরি করছি আমি আর ধন্যি আমার মায়ের পেটের কেন?

ঘন্টু মামা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বললেন, আরে গাড়ল এটাও বুঝলি না। যে মায়ের ছেলে এমন অমৃত বানাতে পারে তার পেটকে ধন্যি না দিয়ে উপায় আছে!

ঘন্টু মামা আলুচপে আরেকটা কামড় দিতে যাচ্ছিলেন তখন আমি উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তোমার সাথে জরুরী কথা আছে। একটু উঠে এসো।

ঘন্টু মামা চপে মজে আছে, আমার কথা শোনার সময় কোথায়! আমাকে বসার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, ওসব কথাটথা পরে হবে, আগে একটা আলুচপ খেয়ে নে।

আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, তোমার শুধু খাওয়া আর খাওয়া! তুমি এতো পেটুক কেন?

ঘন্টু মামা হো হো করে হেসে উঠলেন। জগতে খাওয়া ছাড়া আর কি আছে বল! তার ওপর মান্নানের স্পেশাল আলুচপ হলে তো আর কথাই নেই।

উত্তেজনায় আমার হার্টবিট এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে; আর চাপ সামলাতে পারছিলাম না। জয়াদি বলে দিয়েছে আর কেউ যেন না দেখে তাই সবার সামনে চিঠিখানা দিতেও পারছিনা। আমি আকুতির স্বরে বললাম, প্লীজ একটু আসবে। খুব জরুরী দরকার।

মুখ কাঁচুমাচু করে বলায় কাজ হলো। ঘন্টু মামা উঠলেন। মান্নানকে বললেন, ওই আরো দুইটা চপ ভালো করে ভেজে রাখ। আমি আসছি।

ঘন্টু মামা আর আমি দোকানের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবছা অন্ধকারে ঘন্টু মামার হাতে কাগজটি তুলে দিলাম। কাগজ হাতে নিয়ে ঘন্টু মামা জিজ্ঞেস করলেন, কী এটা?

আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, খুলেই দেখোনা।

ঘন্টু মামা তার বিখ্যাত নোকিয়া ১১০০ মডেলের সেটখানা বের করে টর্চ লাইটের আলো জ্বেলে কাগজে চোখ রাখলেন। অন্ধকারে ঘন্টু মামার মুখের মানচিত্র ঠিক বুঝা যাচ্ছিলোনা। বেশ খানিকক্ষণ মৌন থাকার পর ঘন্টু মামা নীরবতা ভাঙ্গলেন, অ্যাইরে! যা আন্দাজ করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তা সত্যি হয়ে গেলো দেখছি!

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খুশী হওনি?

ঘন্টু মামা বললেন, এতে খুশী হওয়ার কি আছে? বুঝলি এসব প্রেম-ট্রেম আমার জন্য না। জয়াকে তো বুদ্ধিমতী মেয়ে বলেই জানতাম। ও এমন কান্ড করে বসবে বুঝতে পারিনি!

আমার খুব রাগ হতে লাগলো। ভাব নিচ্ছো, তাইনা? এখন সব দোষ জয়াদির! জয়াদি সামনে এলে তোমার অবস্থা কি হয় সে আমার দেখা আছে। নিজে আগ বাড়িয়ে প্রপোজ করার মুরোদ তো নেই ই। উলটো আরেকজনকে দোষারোপ করছে!

ঘন্টু মামা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই এতো রাগ করছিস কেন?

আমি রাগ করবো কেন! আমি তোমার ভাব নেওয়া দেখে বিষ্মিত হচ্ছি মাত্র। তোমার সাত জন্মের ভাগ্য জয়াদির মতো ধনীর দুলালী তোমাকে আগ বাড়িয়ে প্রপোজ করেছে।

ঘন্টু মামা হো হো করে হেসে উঠলেন, জয়া তোকে কতো ঘুষ দিয়েছে বলতো? সেই কখন থেকে ওর হয়ে ওকালতি করেই যাচ্ছিস!

ধুর বাবা আমার কী! আমি তো শুধু চেয়েছি তোমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হোক। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো তুমি জয়াদিকে ভালোবাসোনা? তোমার উত্তর না হলে আমি এখনই জয়াদিকে জানিয়ে আসবো।

ক্ষেপেছিস! ঘরের লক্ষী পায়ে টেলতে আছে! আমি জীবনেও ওকে আগ বাড়িয়ে ভালোলাগার কথা বলতে পারতাম না। এখনই তো ওর চোখের দিকে ভালো করে তাঁকাতে পারিনা; এরপর তো আর তাঁকাতেই পারবোনা

কেন জয়াদির চোখে বিজলী আছে নাকি যে তাঁকালে তোমার চোখ ঝলসে যাবে!

বিজলী বলিস কীরে! বল এটম বোমা! ওই চোখে তাঁকালেই বুকে বিস্ফোরন শুরু হয়ে যায়।

ভালোই তো। হ্যাঁ বলে দাও চট করে।

অনেক সমস্যা আছে

সমস্যার দোহাই দেয়া তোমার মানায় না।

দেখ এ জীবনে এ পাড়ার কতো জনেরই প্রেম-বিরহের গল্প আমার হাত দিয়ে লেখা হয়েছে। তাতে করে বুঝেছি প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটা দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হয়ে যায়। নিজের মধ্যে রেসপনসিবিলিটি না থাকলে একটা সম্পর্কের ভার বহন করে চলা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। জবাবদিহিতা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। আসল সমস্যা হলো রেসপনসিবিলিটি। আমি আমার নিজেকে তো চিনি তাই যতো দুশ্চিন্তা।

ঘন্টু মামার কথা শুনে আমি চূড়ান্ত বিষ্মিত। আমি বললাম, এ কী গো মামা! তুমি এতো জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলছো যে!

জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বললাম কোথায়? এটা হচ্ছে প্র্যাক্টিক্যাল জ্ঞান। চোখের সামনে অনেককেই তো দেখছি তাই বললাম।

আমি এতোকিছু বুঝতে চাইনা। তোমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হচ্ছে এটাই ফাইনাল কথা। আমি কালকেই জয়াদিকে বলে দেবো তুমি উনার প্রস্তাব গ্রহন করেছো। এবার চলো মান্নানের স্পেশাল আলুচপ খাওয়াবে।

যাই হোক এভাবেই ঘন্টু মামা আর জয়াদির মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। গত দেড় বছর থেকে দেখছি ওরা দুজন ভালো-মন্দের মাঝামাঝি একটা অবস্থানে বেশ কাটিয়ে দিচ্ছে। জয়াদি প্রতিনিয়ত ঘন্টুমামাকে ঘরমুখো রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কোন প্রচেষ্ঠাই কাজ দিচ্ছেনা। ঘন্টু মামা আছেন ঘন্টু মামার মতো। যদিও অনেকের কাছেই ঘন্টুমামার কাজকর্ম নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। তবে আমাদের কাছে ঘন্টু মামা ইজ দ্য বস। ঘন্টু মামাকে বাদ দিয়ে আমরা কোন কাজের কথা চিন্তাই করতে পারিনা।

রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

ছিটমহল - ইতিহাসের এক অযাচিত বিষফোঁড়া

 
'নিজভূমে পরবাসীএই কথাটির সাথে আমরা কমবেশী পরিচিতআর এই কথাগুলোর বাস্তব প্রমাণ বাংলাদেশ-ভারতের মোট ১৬২টি ছিটমহলের মানুষতাদের নিজস্ব ভূমি আছেনামমাত্রে তারা একটি দেশের অংশ, কিন্তু তাদের নূন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যাপারে সরকারের কোন মাথাব্যাথা নেই

বাংলাদেশ ও ভারত সরকার কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েও উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নিসর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতে স্থল সীমান্ত চুক্তি অর্থাৎ ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া আটকে ছিলসম্প্রতি পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়  তার অবস্থান পালটেছেনঅনেকদিন থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় ইস্যুতে তার সমর্থন জানানোর ঘোষনাকে সাধুবাদ জানাই

আমাদের অনেকের কাছেই ছিটমহল ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার নয়একটি দেশের ভূমি আরেক দেশের ভেতরে গেল কীভাবে! কিছুদিন আগেও এ ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক বোধগম্য ছিলনা! ছিটমহল কী! তাই নিয়ে লিখতে বসেছি আজ

সহজভাবে বলতে গেলে ছিটমহল হচ্ছে কোন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদছিটমহল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ওখানে যেতে হলে অন্য দেশটির জমির উপর দিয়ে যেতে হয়

বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে মোট ১৬২টি ছিটমহল রয়েছেএর মধ্যে ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আর বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল রয়েছেবাংলাদেশ ও ভারতের মোট ছিটমহলের আয়তন ২৪ হাজার ২৬৮ একরবাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ৭ হাজার ১১০ একরঅন্যদিকে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ১৭ হাজার ১৫৮ একর

বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো প্রশাসনিক দিক থেকে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানার অন্তর্গতএদের মধ্যে লালমনিরহাটের আওতায় ৩৩টি ও কুড়িগ্রামের আওতায় রয়েছে ১৮টি ছিটমহলভৌগলিক দিক থেকে এদের ৪৭টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কুচবিহার জেলার অভ্যন্তরে এবং ৪টি জলপাইগুড়ি জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত

বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ছিটমহলগুলোর মধ্যে পঞ্চগড় জেলার সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ থানায় মোট ৩৬টি, নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় ৪টি, লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম থানায় মোট ৫৯টি এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানায় মোট ১২টি ছিটমহল অবস্থিতপ্রশাসনিক দিক থেকে এগুলি সবই ভারতের কুচবিহার জেলার অন্তর্গত

ছিটমহলের ইতিহাসঃ
ছিটমহল সৃষ্টির পেছনে মূলত দায়ী রেডক্লীফের বিতর্কিত মানচিত্র তবে এই মানচিত্র নিয়ে আলোচনার আগে আরো কিছু বিষয় জানতে হবে

ছিটমহলের ইতিহাসের শুরু রংপুর অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পরআকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ ষোল শতকে (১৫৭৫ সালে) রংপুর অঞ্চলের কিছু অংশ জয় করেসতের শতকে (১৬৮৬ সালে) এই পুরো অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ঘোড়াঘাট সরকারের অধীনে ন্যস্ত হয়অর্থাৎ তখন রংপুর অঞ্চল মোগলদের অধীন এবং তার উত্তরে স্বাধীন কোচ রাজার রাজ্য কোচবিহার ব্রিটিশ আমলেও একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল

কোচ বিহার প্রিন্সলি স্টেট হিসেবে তথাকথিত স্বাধীনভাবে ইংরেজ আমলটিও পার করেতে পেরেছিলকোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ মূলত ছিল সামন্ততাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, ছিল ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মহলের বিনিময়বলা হয়ে থাকে, সেই মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তার পাড়ে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশ্যেখেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতোখেলায় হারজিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতোসাথে সাথে বদলাতো সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানাএভাবেই নাকি সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্যের ছিট মহল

আজকের ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের সমস্ত ভূমি ব্রিটিশ রাজের অন্তর্গত ছিল নাপ্রায় ৪০ শতাংশ ছিল বিভিন্ন তথাকথিতস্বাধীন রাজ্যযেগুলিকে বলা হতোনেটিভ স্টেটবাপ্রিন্সলি স্টেটএ রাজ্যগুলি কার্যত ছিল ব্রিটিশদের অধীন তবে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে রাজাদের কর্তৃত্ব বজায় ছিলহায়দ্রাবাদের নিজামের মত কোচ রাজাও ব্রিটিশদের নেটিভ স্টেট-এর রাজা হিসেবে থেকে যানভারত ভাগের সময় এরূপ রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া বা ভাগ করার এখতিয়ার ব্রিটিশ রাজের ছিল না

১৯৪৭ সালে ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এক্ট-১৯৪৭পাশ করেএ আইন অনুসরণ করে সেই বছরেই ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ রাজ বিলুপ্ত হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র গঠিত হয়প্রণীত আইনে বলা হয়, উপমহাদেশেরস্বাধীনঅঞ্চলগুলোর নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেয়া সুযোগ থাকবে অথবা তারা স্বাধীন সত্তা নিয়েও ইচ্ছে করলে থাকতে পারবেরাঙামাটির রামগড় ও বান্দরবান পূর্ব পাকিস্তানের সাথে এবং পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য ত্রিপুরা ও উত্তরের কোচ বিহার ভারতের সাথে যুক্ত হয়

অন্য কোন রাজ্যে জমি নিয়ে সমস্যা না ঘটলেও সমস্যা বাঁধে কুচবিহারেতখনকার কোচ রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারি স্বত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার মধ্যেএকইভাবে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারের কিছু তালুক ছিল কুচবিহার সীমানার ভেতরএ নিয়ে জমিদারদ্বয় কোন সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের উদ্দেশ্যে সীমানা নির্ধারণকল্পে সিরিল রেডক্লিফকে সভাপতি করে কমিশন গঠন করা হয়তিনি ছিলেন একজন আইনবেত্তা মাত্র, দেশের সীমানা নির্ধারণের মত কাজে তার কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল নাকমিশনের অন্য সদস্যদেরও একই হাল ছিলকিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত ব্রিটিশ সরকারের না ছিল উদ্যম, না ছিল তার হাতে সময়

১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই ভারতে ভারতে আসেন এবং মাত্র ছয় সপ্তাহের কাজ করে ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেনকমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারা দেশের সীমারেখা নির্ধারণ প্রভাবিত হয়েছেকমিশন কোচ বিহার ও রংপুর এলাকার ছিটমহলগুলো নিয়ে কোন সমাধানে আসতে পারেনি এবং ছিটমহলগুলো বজায় রাখেএভাবে রেডক্লিফের অংকিত ম্যাপ অনুসারেই শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগ হয় ও ছিট মহলগুলো থেকে যায়
তথ্যসূত্রঃ এই পোস্টটি তৈরি করতে উইকিপিডিয়া ও কয়েকটি বাংলা ব্লগের সাহায্য নেওয়া হয়েছে


শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

হৃদয় ভাঙ্গার শব্দ

তোমাকে অনেকদিন দেখিনি
সে জন্য বুকে একটা চাপা ব্যাথা আছে অবশ্যই,
সেই সাথে আছে তোমাকে কাছে পাওয়ার প্রচন্ড আকুলতা।
তোমাকে দেখবো বলে কত রজনী
তাঁরাদের সাথে কথোপকথনে কাটিয়েছি,
চোখ বুঝেও আমি আমার সমস্ত সত্ত্বাজুড়ে
তোমার উপস্থিতি অনুভব করেছি।

কিন্ত আজ যখন তোমাকে দেখলাম,
অপরাজেয় বাংলার মতো বাকরুদ্ধ হয়ে রইলাম,
যেন এ জীবনের সব ভাষা বর্ণহীন হয়ে,
আমার উঠোনে ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে,
কিন্ত কি এক অদৃশ্য বাধায় আমার
কপাট খুলে যেতে পারছেনা !

ক্যাম্পাসের কোমল বৃষ্টিভেজা দূর্বা মাড়িয়ে,
চলেছ এক যুবকের হাত ধরে,
তোমার মসৃণ পদযুগলে পিষ্ট হয়ে,
দূর্বাগুলো যেন চিৎকার করে বলছে,
আমাকে এভাবে শেষ করে দিওনা,
এ যেন দূর্বা নয়,
আমার হৃদয়ের আর্তচিৎকার!

আমার দৃষ্টি সীমায় যতোদূর চোখ যায়,
চেয়ে রইলাম তোমাদের পথপানে,
একসময় তুমি অদৃশ্য হয়ে গেলে
কিন্ত রয়ে গেল তোমার পদরেখা।
সর্পিল পদরেখাগুলো যেন বিষাক্ত সর্পিনী হয়ে
আমায় ক্ষত-বিক্ষত করছে ছোবলে ছোবলে।

তোমার মিথ্যে ছলনাময় মিষ্টি কথাগুলো
আজ বড্ড মনে পড়ছে,
তোমার বিগত মিষ্টবিষ বাক্যবাণ,
আমার কর্ণকোটরে বাজছে,
হৃদয় ভাঙার শব্দের মতো।

গোধুলির আভা

শেষ বিকেলের পড়ন্ত সূর্য্যরশ্নি যখন জানালার পর্দা ভেদ করে
তোমার কোমল গালে আলতো করে ছুঁয়ে যায়,
হালকা হলুদাভ আবেশ ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত মুখ ভঙ্গিমায়,
তখন সত্যি এক অদৃশ্য ঝড় বয়ে যায় আমার ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ের
প্রতিটি কোনায় কোনায়!

যখন অবাধ্য কেশগুচ্ছ কপালের স্নিগ্ধ জমিন ছেড়ে
ধীরলয়ে দোল খায় চোখের পাতায় পাতায়,
দীঘির কালো স্বচ্ছ জলের মতো যেন মিশে যেতে চায়
মায়াবী চোখের আনন্দ অশ্রুকণায়।

যখন নির্জন বিকেলে বয়ে যাওয়া চৈতালি হাওয়া
মধুর আবেশে আঁচড়ে পড়ে তোমার স্নিগ্ধ মুখাবয়বে,
ঠিক তখনি কেশগুচ্ছের আড়ালে দাঁড়িয়ে
কপালের ছোট্র টিপ তার উপস্থিতি জানান দিয়ে যায়।
জোড়া ভ্রু’র স্তব্ধতায় দীপ্ত ভঙ্গিতে অবস্থান করে,
উজ্জ্বল মায়াবী স্নিগ্ধতার মধুময় আবেশে,
তোমার সৌন্দর্য্যে যেন আরেকটু প্রলেপ মেখে দেয়,
মনহারা কাজলকালো টিপ!

কাজল কালো টিপের দীপ্ত উপস্থিতি আমার কাছে
মনে হয় প্রবল প্রতিদ্বন্ধীর মতো,
তুচ্ছ টিপের এমন সৌভাগ্যে
আমি যারপরনাই ঈর্ষান্বিত হয়ে যাই,
মনে হয় এখনি গিয়ে টুটি চেপে ধরি,
বুড়িগঙ্গার বিষাক্ত জলে শ্বাসরুদ্ধ করে
গলা ভর্তি পানি খাইয়ে ডুবিয়ে মারি।

যখন দুষ্টু অথচ মিষ্টি হাসি খেলে যায় তোমার চিবুকে,
তখন মনে হয় গোধুলীর আভা
উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে,
দোল পূর্ণিমার রঙ্গীন আবীরের ন্যায়
ছড়িয়ে পড়ছে তোমার ঠোটের কোনে।

ফাগুন সন্ধ্যাতে বসন্তের মৃদু উত্তাপে,
সামান্য ঘামের কণা যখন চিকন নাসিকা বেয়ে,
মুক্তো দানার মতো উজ্জ্বল্যে; বিন্দু বিন্দু হয়ে
গড়িয়ে পড়ে ঠোট অবধি,
মনে হয় দূরে ছুড়ে ফেলি
আমার যতো আছে ব্যবধি।

হে হৃদয়েশ্বরী,
তোমার মুখচ্ছায়ায় মুগ্ধ আমি!
আমার হৃদয় সমুদ্রে ভালোবাসার,
শুশুকেরা সাঁতার কাটে দিবানিশি।

শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা সিনেমার তালিকা



মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা সিনেমার তালিকা।

১৯৭০-এর দশকঃ

১.জীবন থেকে নেওয়া (১৯৭১) — জহির রায়হান পরিচালিত
২.ওরা ১১ জন (১৯৭২) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
৩.বাঘা বাঙ্গালী (১৯৭২) — আনন্দ পরিচালিত
৪.জয় বাংলা (১৯৭২) — ফকরুল আলম পরিচালিত
৫.অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২) — সুভাষ দত্ত পরিচালিত
৬.ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩) — আলমগীর কবির পরিচালিত
৭.আমার জন্মভূমি (১৯৭৩) — আলমগীর কুমকুম পরিচালিত
৮.সংগ্রাম (১৯৭৩) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
৯.আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩) — খান আতাউর রহমান
১০.আলোর মিছিল (১৯৭৪) — নারয়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত
১১.বাংলার ২৪ বছর (১৯৭৪) — মোহাম্মদ আলী পরিচালিত
১২.কার হাসি কে হাসে (১৯৭৪) — আনন্দ পরিচালিত
১৩.মেঘের অনেক রঙ (১৯৭৬) — হারুন-উর-রশিদ পরিচালিত


১৯৮০-এর দশকঃ

১৪.বাঁধন হারা (১৯৮১) — এ. জে. মিন্টু পরিচালিত
১৫.কলমীলতা (১৯৮১) — শহীদুল হক খান পরিচালিত
১৬.চিৎকার (১৯৮১) — মতিন রহমান পরিচালিত

১৯৯০-এর দশকঃ

১৭.একাত্তরের যীশু (১৯৯৩) — নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু পরিচালিত
১৮.নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৪) — তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত
১৯.আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) — হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত
২০.মুক্তির গান (১৯৯৫) — তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত
২১.হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড (১৯৯৭) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
২২.মুক্তির কথা (১৯৯৯) — তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত

২০০০-এর দশকঃ

২৩.মাটির ময়না (২০০২) — তারেক মাসুদ পরিচালিত
২৪.জয়যাত্রা (২০০৪) — তৌকির আহমেদ পরিচালিত
২৫.শ্যামল ছায়া (২০০৪) — হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত
২৬.খেলাঘর (২০০৬) — মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত

২০১০-এর দশকঃ

২৭.আমার বন্ধু রাশেদ - মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত
২৮ গেরিলা (চলচ্চিত্র) - নাসিরুদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত

আরো আছেঃ এখনো অনেক রাত, মেঘের পর মেঘ ,হৃদয়ে আমার দেশ, হৃদয়ে'৭১, সংগ্রাম, ৭১ এর গেরিলা ও আরো নাম না জানা অনেক।

এটি কোন চূড়ান্ত তালিকা নয়। আপনার জানা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোন চলচ্চিত্রের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে থাকলে দয়া করে মন্তব্যের ঘরে সেই সিনেমার নামটা উল্লেখ করে দিন। আমি পোস্টটা আপডেট করে নেব।

তথ্যসূত্রঃ বাংলা চলচ্চিত্র গ্রুপ

বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৪

কল্পনা নয় বাস্তবের শার্লক হোমস

জেমস বন্ডের মতো কালজয়ী আরেকটি গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস। শত বছর ধরে পাঠক হৃদয়ে যার সপ্রতিভ অবস্থান। মজার ব্যাপার হচ্ছে জেমস বন্ডের মতো এই শার্লক হোমস চরিত্রও বাস্তবের এক ব্যক্তিকে অবলম্বন করে রূপায়িত। তবে চলুন এখন জানি, কে সেই বাস্তবের শার্লক হোমস!

১৮৮৬ সালের মার্চ মাস। প্লাইমাউথের বুশ ভিলাতে ডাক্তারির পাশাপাশি গোয়েন্দা কাহিনী লিখায় হাত দেন আর্থার কোনান ডয়েল। ১৮৮৭ সালে A Tangled Skin উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি শার্লক হোমসের সৃষ্টি করেন। প্রথম দিকে শার্লকের নাম রাখা হয়েছিলো শেরিনফোর্ড হোমস। কিন্তু এই নাম পছন্দমতো না হওয়ায় বদলে রাখলেন শার্লক হোমস। সেই সাথে উপন্যাসের নাম বদলে রাখলেন ‘এ্যা স্টাডি ইন স্কারলেট’। একসময় ডাক্তারি পেশা ছেড়ে লেখালেখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

শিল্পীর চোখে শার্লক হোমস
 উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম ঠিক হলো, কিন্তু তারপরও ডয়েল তীব্র উৎকন্ঠায় ভুগছেন। তার মনে শংকা ছিলো তিনি কি কাহিনীটাকে এগিয়ে নিতে পারবেন! তিনি এমন এক গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করতে চান যা তখনকার জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র দুপ্যাঁকেও বুদ্ধিতে ছাড়িয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো ডক্টর বেলের কথা।

১৮৭০ সালে কোনান ডয়েল এডিনবরা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। সে সময় ডক্টর যোসেফ বেল এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এডিনবরা মেডিক্যাল জার্নালের সম্পাদক। এডিনবরা গোলন্দাজ বাহিনীর তিনিই তখন উপদেষ্টা চিকিৎসক। কোনান ডয়েল নিজেই বলেছেন, “শার্লক হোমস চরিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে আমি বারবার তার কথাই ভাবছিলাম। আমার পুরনো শিক্ষক যোসেফ বেল। তাঁর ঈগল পাখির মতো চোখ-মুখ, কৌতূহলোদ্দীপক চলাফেরা, যেকোন ব্যাপারে তাঁর গভীর চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের অদ্ভুত ক্ষমতা…এ সবই আমার বারবার মনে পড়ছিলো।”

এডিনবরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে কোনান ডয়েল, ডক্টর বেলের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন, রোগীদের কেস হিস্ট্রি লিখতেন। তখন ডয়েল, বেলের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে থেকে তার বিভিন্ন কর্মকান্ড স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। একবার একজন রোগীকে দেখেই বেল বলে দিয়েছিলেন, “ভদ্রলোক হাইল্যান্ড রেজিমেন্টে একজন নন-কমিশনড অফিসার ছিলেন। বার্বাডোজে কিছুদিন কাটিয়ে এসেছেন।”

উপস্থিত হতভম্ব ছাত্রদের সামনে ডক্টর বেল ঘটনাটির ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন এভাবে, “ ভদ্রলোকের চেহারা, আচার-আচরণ বেশ সম্ভ্রান্ত কিন্তু উনি মাথা থেকে টুপি খোলেননি। সেনাবাহিনীর লোকেরা টুপি না খোলায় অভ্যস্ত। ভদ্রলোক নিশ্চয় কয়েকদিন আগে অবসর নিয়েছেন, তা না হলে তিনি এই সাধারণ ভব্যতায় অভ্যস্ত হতেন। ভদ্রলোক অন্যের উপর কর্তৃত্ব ফলাতে ভালোবাসেন, স্কটল্যান্ডের লোকের এ রকম অভ্যাস থাকে। ভদ্রলোকের গোদ রোগ হয়েছে, ওটা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের রোগ, ব্রিটেনের নয়। ভদ্রলোক যে বার্বাডোজে ছিলেন, এটাই তার সবচেয়ে বড়প্রমাণ।”

 উপরের ব্যাখ্যা থেকেই বুঝা যায় ডক্টর বেল কতোটা তীক্ষ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। আর তার সেই বুদ্ধিমত্তায় বেশী আকৃষ্ট হয়েছিলেন কোনান ডয়েল। তাইতো শার্লক হোমস চরিত্র অলংকরণ করতে গিয়ে বারবার বেলের কথা মনে হয়েছে তার। ১৮৯২ সালের ৪মে কোনান ডয়েল এক চিঠিতে ডক্টর বেলকে লিখেছিলেন, “এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আপনাকে দেখেই আমি শার্লক হোমস এর চরিত্র সৃষ্টি করেছি। শার্লক হোমসের বিশ্লেষণী ক্ষমতা কোনও বানানো অতিরঞ্জিত ব্যাপার নয়। এডিনবরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে আমি নিজে আপনাকে ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখেছি।”

ছাত্রের এ গুরুদক্ষিণায় ডক্টর বেল অবশ্যই খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে শার্লক হোমসের উৎস সম্বন্ধে অন্য ধারণা পোষণ করতেন। এক চিঠিতে তিনি ডয়েলকে লিখেছিলেন, “আমারতো মনে হয় তুমিই শার্লক হোমস। আর তুমি সেটা ভালো করেই জানো।”

আর্থার কোনান ডয়েল, শার্লক হোমসকে নিয়ে চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি ছোটোগল্প লিখেছেন। ১ম কাহিনী ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। ২য় কাহিনী ‘দ্য সাইন অব দা ফোর’ ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮৯১ সালে দ্য স্ট্যান্ড ম্যাগাজিন পত্রিকায় প্রথম ছোটগল্পের সিরিজটি প্রকাশিত হওয়ার পরই শার্লক হোমস চরিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত হোমসকে নিয়ে একগুচ্ছ ছোটগল্পের সিরিজ ও আরও দুটি ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। হোমস কাহিনীর পটভূমির সময়কাল ১৮৮০ থেকে ১৯০৭ সাল। শেষ ঘটনাটির সময়কাল অবশ্য ১৯১৪।

আর্থার কোনান ডোয়েল
 শার্লক হোমস চরিত্র এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো যে দিনদিন এর নতুন কাহিনীর পাঠক চাহিদা বেড়েই চলেছিলো। এক চরিত্রকে নিয়ে বারবার লিখতে লিখতে কোনান ডয়েল বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়া গোয়েন্দা কাহিনী লিখতে গেলে প্রয়োজন গভীর চিন্তাভাবনার। তাই শেষদিকে তিনি শার্লক হোমসকে নিয়ে লেখা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাঠক চাহিদার কাছে তিনি হার মেনেছিলেন। কোনান ডয়েলের মৃত্যুর পরও শার্লক হোমসকে নিয়ে অনেক কাহিনী লিখা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত হয়েছে অজস্র চলচিত্র।

আজও বিশ্বের রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের কাছে শার্লক হোমস সত্যিকারের এক জীবন্ত চরিত্র। শার্লক হোমস যে একটা কাল্পনিক চরিত্র, একথা আজও অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননা। এখনও তার নামে ২২১/বি, বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় সপ্তাহে গড়ে ৫০-৬০ খানা চিঠি আসে । গল্পের চিঠিগুলোর উত্তর দিতেন তার সহকারী বন্ধু ওয়াটসন। কিন্তু এখন ওয়াটসন না থাকলেও উত্তর দেওয়া হয় ‘হোমস সোসাইটি’ এর পক্ষ থেকে । সবাইকে জানানো হয়, আমরা দুঃখিত! শার্লক হোমস এখন গোয়েন্দাগিরি করছেন না, তিনি তার পেশা ছেড়ে মৌমাছি পালনে ব্যস্ত। সত্যিই এ এক অদ্ভুত ব্যাপার।

কি পাঠাবেন নাকি আপনিও একটি চিঠি! বলা যায়না গল্পের শার্লক হোমস বাস্তবে উত্তর দিয়ে দিতে পারেন!!!

Copyright © 2014 রিপন ঘোষের খেরোখাতা All Right Reserved
^
Blogger দ্বারা পরিচালিত.