আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে

Latest News:
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০১৫

ঘন্টু মামা (পর্ব-৫)

গড়ের মাঠ বলতে যা বুঝায় আমাদের পকেট এখন ঠিক তাই। বাসায় ফেরার ভাড়া পর্যন্ত পকেটে নেই। রাগে আমার গা রি রি করছে। ঘন্টু মামাকে পেছনে ফেলে আমি আগে আগে হাঁটছি। রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে ঘন্টু মামার সাথে এখনও একটা কথা বলিনি। চুপচাপ অনেকটা হাঁটার পর ঘন্টু মামা আমার প্রায় কাছাকাছি এসে বললেন, তুই কী মৌনব্রত পালন করছিস নাকি?

আমি কোনরকম উত্তর দিলাম না। ঘন্টু মামা ব্যাপারটা বুঝতে পেরে আমাকে বললেন, রাগ করিস না মুন্না। বললাম তো বাসায় ফিরে তোর টাকা দিয়ে দেব। আচ্ছা পাঁচশর সাথে আরো পঞ্চাশ টাকা বাড়িয়ে দেব। এবার খুশী তো?

আমি চোখ বড় করে ঘন্টু মামার দিকে তাঁকালাম। ঘন্টু মামা দুষ্টুমির হাসি হেসে বললেন, মনে করিস না আবার তোকে ঘুষ দিচ্ছি

এবার আমি ঘন্টু মামার দিকে ফিরে বললাম, তোমার শরীর আসলে কীসের চামড়া দিয়ে তৈরী? এই অল্প সময়ের মধ্যে দুই-দুইবার অপমানিত হয়েও তোমার কোন ভাবান্তর নেই!

আমার কথা শুনে ঘন্টু মামা এমন হো হো করে হেসে উঠলেন যে পাশ দিয়ে যাওয়া কয়েকজন পথচারীও আমাদের দিকে তাঁকাতে বাধ্য হলো। এক গাল হেসে নিয়ে ঘন্টু মামা আমাকে বললেন, বুঝলি! জন্মের সময় আমার গায়ে মানুষের চামড়াই ছিল। তবে হলো কী, আমার মা মানে তোর দিদা একজন দিব্যদৃষ্টি সম্পন্ন মহিলা। আমার জন্মের পরপরই তিনি বুঝে নিয়েছিলেন তার এই ছেলের লজ্জা-শরম-অপমান
বোধ একটু কম হবে, তাই তিনি বুদ্ধি করে তখনই আমার গায়ে একটা গন্ডারের চামড়া সেলাই করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে এই সব লজ্জ্বা-শরম-অপমানবোধ আমার নেই বললেই চলে।

ঘন্টু মামার এহেন কথা শুনে আমার ভীষন হাসি পাচ্ছিলো। একটা লোক কী নির্দ্বিধায় বকে যাচ্ছে! আমি চেহারায় যথেষ্ট কাঠিন্য ফুটিয়ে বললাম, রাখো তোমার বাজে কথা। এখন বাসায় ফিরবো কী করে সেটা বলো?

ঘন্টু মামা বললেন, এ আর চিন্তা কী! পায়ে হেঁটেই ফিরে যাবো।

আমি বললাম, পাগল! এখান থেকে বাসা কতোদূর হিসেব আছে! আমি এতোদূর হেঁটে যেতে পারবোনা।

হঠাত করে ঘন্টু মামা পায়ে ভর দিয়ে রাস্তায় বসে পড়লেন। আমি আশ্চর্য্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী ব্যাপার! বসে পড়লে যে?

ঘন্টু মামা তার নিজের কাঁধের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, হাঁটতে যখন পারবিনা তখন কী আর করা! তুই আমার কাঁধে চড়ে বস। আমি তোকে কাঁধে নিয়ে বাসায় ফিরবো।

আমি যারপরনাই বিষ্মিত হয়ে বললাম, পাগল হয়েছো। আচ্ছা কাইন্ডলী বলবে তোমার মাথায় এতো উদ্ভট চিন্তা আসে কীভাবে?

ঘন্টু মামা হেসে বলল, বুঝলি আমার এই মাথাটা হচ্ছে চিন্তা তৈরির কারখানা। উপস্থিত বুদ্ধিতে আমার জুড়ি মেলা ভার! ঐ যে ব্যাকরণের ভাষায় বলে না প্রত্যুতপন্নমতিতা!

আমি ব্যঙ্গ করে বললাম, প্রত্যুতপন্নমতি না ছাই! তোমার পাল্লায় যে পড়েছে তার অবস্থা একেবারে কেরোসিন হয়ে যাবে। এতো চেষ্টা করেও যে কেন তোমার সঙ্গ ছাড়তে পারিনা!

ঘন্টু মামা হেসে বলল, এটাই ঘনাচরণ সরকারের কারিশমা! একবার আমার সাথে যে সেঁটে গেছে সে আর আলগা হতে পারেনা।

ঘন্টু মামা কথা শেষ করার আগেই তার মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। মোবাইল স্ক্রিনে চোখ বুলিয়ে ঘন্টু মামার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। উৎফুল্ল হয়ে আমাকে বললেন, বলেছিলাম না যোগাযোগ ওকে করতেই হবে। ফোন রিসিভ করতেই ওপর পাশ থেকে ভেসে এলো, ঘনাচরণ বাবু এখন ঠিক কোথায় আছেন?

ঘন্টু মামা বললেন, আপনার অফিস থেকে বেরিয়ে ডানদিকে দুই-আড়াইশো গজ এগুতে থাকুন। আমাদের পেয়ে যাবেন।

ওপর পাশ থেকে উত্তর এলো, একটু অপেক্ষা করুন, আমি আসছি।

কল কেটে দিতেই আমি ঈশারায় ঘন্টু মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, কে?

ঘন্টু মামা ভুবন জয়ের হাসি হেসে বললেন, মিস্টার বাঁধন এস চৌধুরী।

আমি বললাম, এই বাঁধন এস চৌধুরীটা আবার কে?

ঘন্টু মামা বললেন, এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেলি! এই একটু আগে যার অফিস থেকে এলাম।

আমি বিষ্মিত হয়ে বললাম, এখন আবার কী জন্য! একটু আগেই না দূর দূর করে তাড়িয়ে দিলো!

ঘন্টু মামা বললেন, যতোই তাড়িয়ে দিক না কেন, উনি যে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন তা আমি জানতাম। সে জন্যেই তো সময় কাটানোর জন্যে ইচ্ছে না থাকাও সত্ত্বেও এতো প্লেট বিরিয়ানী খেলাম। এ সব ঘনাচরণ সরকারের কারিশমা!

আমি থামিয়ে দিয়ে বললাম, হয়েছে হয়েছে আর শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে হবেনা। তোমার ব্যাপার-স্যাপার আমার ভালো ঠেকছে না। তুমি এই লোকটাকে শুধু শুধু এমন ব্ল্যাকমেইলিং করছো কেন?
ঘন্টু মামা রহস্যের হাসি হেসে বললেন, ধুর ধুর আমি কোন ব্ল্যাকমেইলিং করছি না। কেউ যদি নিজে থেকে ভয় পায় আমার কী করার আছে! আমি শুধু দূর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে একটু ফায়দা হাসিল করতে চাইছি মাত্র।

আমি বললাম, না না এটা মোটেও ঠিক না।

ঠিক তখন মার্সিডিজ বেঞ্জের একটি কালো গাড়ি আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালো। ঘন্টু মামা গাড়ির গ্লাসে নিজের চুলকে একটু ঠিক করে নিলেন। গাড়ি থেকে বাঁধন এস চৌধুরী বেরিয়ে এলেন। ঘন্টু মামা হেসে বললেন, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।

বাঁধন চৌধুরী প্রথমেই বললেন, এবার কীসে স্পন্সর দরকার? কতো দরকার ঝটপট বলে ফেলুন?

ঘন্টু মামা বিস্তারিত বলতেই বাঁধন চৌধুরী ঘন্টু মামাকে বললেন, আমার পি.এস আগামীকাল আপনার কাছে চেক পৌছে দেবে।

ঘন্টু মামা হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে বললেন, ঠিক আছে।

বাঁধন এস চৌধুরী গাড়িতে উঠতে যাবেন তখন ঘন্টু মামা বললেন, আপনার কাছে খুচরো দুশো টাকা হবে। আমার কাছে একটা এক হাজার টাকার নোট; কোথাও ভাংতি পাচ্ছিনা।

বাঁধন চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে নিজের ওয়ালেট চেক করে বললেন, স্যরি আমার কাছেও খুচরো টাকা নেই।

গাড়িটি চলে যেতেই ঘন্টু মামা বাঁধন এস চৌধুরীর চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলেন। তারপর কী ভেবে আমাকে বললেন, আজকাল কী সব মোবাইল ব্যাংকিং-ট্যাংকিং বেরিয়েছে না? আমরা তো আমাদের মোবাইলে টাকা আনাতে পারি।

আমি বললাম, তা পারি। কিন্তু মোবাইলে আগে একাউন্ট খুলতে হয়। আমার কোন একাউন্ট নেই। তোমার থাকলে আনাতে পারো।

ঘন্টু মামা নিজের চুল টানতে টানতে বলল, আমার একাউন্ট আসবে কোত্থেকে! তুইও কি করিস! একটা একাউন্ট খুলে রাখতে পারিস না? তোর একাউন্ট থাকলে তো জয়াকে বলে কিছু টাকা আনতে পারতাম।

আমি বললাম, জয়াদি দেবে টাকা! জয়াদি সাফ বলে দিয়েছে তোমাকে আর কোন টাকা দেবেনা। তুমি আজ পর্যন্ত কতো টাকা ধার এনেছো মনে আছে? একটা টাকা ফেরত দিয়েছো?

ঘন্টু মামা বললেন, ধার করলেই ফেরত দিতে হবে এমন কোন কথা আছে নাকি? তাছাড়া জয়ার টাকা মানে তো আমার টাকা তাইনা?

আমি বললাম, এমনভাবে বলছো যেন তুমি নিজে রুজি করে ওর কাছে টাকা জমা রেখেছো!

ঘন্টু মামা চিন্তিত মুখে বললেন, “বাদ দে ও কথা। এখন কী করি বল তো। দুপুরে খেলে আমার শরীরে এমনিতেই আলসেমী চলে আসে। আর ভরদুপুরে এই রোদে এতো রাস্তা হেঁটে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।” কথা শেষ করেই ঘন্টু মামা একটা অটোকে ঈশারায় থামতে বললেন। আমরা দুজন অটোতে উঠে বসলাম কিন্তু এখনও জানিনা অটো ভাড়া কোত্থেকে আসবে!

রবিবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৫

ঘন্টু মামা (পর্ব-৪)

রেস্টুরেন্টের ওয়েটার হা করে ঘন্টু মামার খাওয়া দেখছে। তার অবাক চাহনীতে এটা স্পষ্ট যে এরকম খাদক মানুষ সে আগে কখনো দেখেনি। অবশ্য আমার কাছে ব্যাপারটা একদম স্বাভাবিক কেননা নিয়মিত ঘন্টু মামার এমন ভুড়িভোজ দেখে আমি অভ্যস্ত।

ঘন্টু মামার শরীর এমন দশাসই কিছু না যে তার এতো খাবার খেতে হবে! এছাড়া তিনি এমন কোন পরিশ্রমী কাজও করেন না যাতে শরীর থেকে প্রচুর ক্যালরি ক্ষয় হয়! তাহলে এতো খাদ্যের চাহিদা তার আসে কোথা থেকে!

পাঁচ ফুট সাড়ে সাত ইঞ্চির ঘন্টু মামা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী। মাত্র আধা ইঞ্চির জন্য পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি না হতে পারায় ঘন্টু মামাকে প্রায়ই আক্ষেপ করে বলতে শুনি, ভগবানটা বড় কিপটে! আধা ইঞ্চির জন্য কেউ কাউকে এভাবে আটকে রাখে!

ঘন্টু মামা শরীরের প্রতি কোনকালেই সচেতন ছিলেন না। জয়াদির সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর কয়েকদিন জিম করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু জিমের পরিশ্রম তার সহ্য হয়নি। একদিন একটা ভারী ডাম্বেল তুলতে গিয়ে কোমড়ের হাড়ে মোচড় খেয়ে সাতদিন বেড রেস্টে থাকতে হয়েছিল। সেই থেকে ঘন্টু মামা আর জিমের দিকে পা বাড়াননি।

ঘন্টু মামার গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা। চুলগুলো কোকড়ানো। ইদানীং মাথার মাঝখানে চুল একটু হালকা হয়ে এসেছে। চুল হালকা হওয়ার লক্ষন দেখে আমরা তাঁকে প্রায়ই খেপাই। কিন্তু ঘন্টু মামা থুড়ি মেরে আমাদের উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আমার চৌদ্দগোষ্ঠীতে কারো টাক নেই। কাজেই তোরা যতোই নাচানাচি করিস না কেন আমার মাথায় টাক পড়ার কোন সম্ভাবনাই নেই।

পাঁচ নম্বর প্লেট শেষ করে ঘন্টু মামা তৃপ্তির ঢেকুর তুলে ওয়েটারকে কাছে ডাকলেন। তারপর তাঁকে বললেন, কেউ খাওয়ার সময় তার দিকে এভাবে তাঁকিয়ে থাকতে নেই। শোন, আজ যদি আমার পেট ব্যাথা করে তাহলে কাল এসে কড়ায়-গন্ডায় শোধ তুলবো।

ওয়েটারকে খানিকটা অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল। সে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। ঘন্টু মামা আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুই দেখি এক প্লেটই শেষ করতে পারলিনা!

ঘন্টু মামা পাশ ফিরে দেখলেন ওয়েটার তখনও ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি বললেন, কি হে এখনও স্ট্যাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছো! যাও একটা কোক নিয়ে এসো। আর মনে করে বত্রিশ জর্দা দিয়ে একটা কড়া পান আনবে।

ওয়েটার কোকের বোতল আর পান ঘন্টু মামার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, আর কিছু লাগবে স্যার?

ঘন্টু মামা হাঁফ ছেড়ে বললেন, যাক বাবা! তুমি তাহলে কথাও বলতে পারো। আমি তো ভেবেছিলাম বোবা। এবার দয়া করে বিলটা নিয়ে এসো।

ওয়েটার বিল হাতে দিতেই ঘন্টু মামার চোখ কপালে উঠলো। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, এ যে দেখি দিনে-দুপুরে ডাকাতি! এতো টাকা বিল কীভাবে হয়?

ওয়েটার বিনয়ী ভঙ্গিতে বললো, স্যার ছয়টা কাচ্চি বিরিয়ানী, দুই বোতল মিনারেল ওয়াটার, একটা হাফ লিটার কোক, একটা পান আর পনের শতাংশ ভ্যাট মিলিয়ে মোট সতেরশো সাত টাকা পঞ্চান্ন পয়সা।

ঘন্টু মামা রেগে গিয়ে বললেন, বললেই হলো! অন্য জায়গায় এর চেয়ে অনেক কম দামে খেতে পারতাম।

ওয়েটার মৃদু হেসে বললো, বেশী দূর যাওয়ার দরকার নেই স্যার। রাস্তার ওপাশে গেলেই এর চেয়ে অনেক কম দামে খাবার পাবেন।

ঘন্টু মামা বললেন, ইয়ার্কি মারছো? ডাক দাও তোমার মালিককে।

ওয়েটার মাথা চুলকে বলল, আমাদের মালিকের কী এই একটা বিজনেস! উনি অন্য জায়গায় ব্যস্ত আছেন। আপনি ম্যানেজারের সাথে কথা বলতে পারেন।

ঘন্টু মামা উচ্চ স্বরেই বললেন, ডাক দাও তোমাদের ম্যানেজারকে।
ঘন্টু মামার উচ্চস্বরে কথা শুনে অন্যান্য টেবিলের মানুষগুলোও আমাদের দিকে বারবার তাঁকাচ্ছে। ঘন্টু মামার এহেন আচরণে আমার অস্বস্তি লাগছে। ওয়েটার চলে যেতে আমি ঘন্টু মামাকে বললাম, এখানে খাবারের এরকমই দাম। দেখছো না পুরো রেস্টুরেন্টে এসি লাগানো।

ঘন্টু মামা এবার আমার ওপর ক্ষেপে গেলেন। “এসি লাগানো তো কী হয়েছে? আমি কি ঠান্ডা হাওয়া খেতে এসেছি!”

খানিক পর ম্যানেজার এসে ঘন্টু মামাকে বললেন, আপনার সমস্যাটা কী জানতে পারি?

ঘন্টু মামা বললেন, সমস্যার শেষ আছে নাকি! আপনারা এখানে ব্যবসা করতে বসেছেন নাকি ডাকাতি করতে বসেছেন?

ম্যানেজার যথেষ্ট বিনয় করেই বললেন, দেখুন এখানে যারা খেতে আসে তারা খাবারের বেশী দাম জেনেই আসে। আমরা কাউকে জোর করে আসতে বলিনা। আপনার যতো বিল হয়েছে তা সব পরিশোধ করতে হবে। বিল পরিশোধ না করে যেতে দেওয়া হবেনা।

ঘন্টু মামার গলা একটু মিইয়ে আসলো। তার চেহারায় দুশ্চিন্তার ছায়া দেখতে পেলাম। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে ম্যানেজারকে বললেন, আপনি যান। আমি আসছি।

আমি এতোক্ষণ চুপচাপ ঘন্টু মামার কান্ড-কারখানা দেখছিলাম। ম্যানেজার চলে যেতেই ঘন্টু মামা আমাকে বললেন, সব টাকা না দিলে শালারা ছাড়বে বলে মনে হয়না! কিন্তু এখন কি করি?

আমি বললাম, কী আর করবে? বিল পরিশোধ করবে।

ঘন্টু মামা বললেন, আমার কাছে বারোশো টাকার মতো। বাকি টাকা পাবো কোথায়! তোর কাছে কিছু টাকা ধার হবে?

আমি বললাম, আমার কাছে পাঁচশো টাকা আছে। বাবা পুরো সপ্তাহের মধ্যে আর একটি টাকাও দেবেনা। আমি এই টাকা দিতে পারবোনা।

ঘন্টু মামা মিনতির সুরে বললেন, এমন করিস না মুন্না। এই বিপদে এমন করতে নেই। আমি বাসায় গিয়ে তোর টাকা ফেরত দিয়ে দেবো। তাছাড়া খাবার তো আমি একা খাইনি। তুই ও তো খেয়েছিস তাইনা?

আমি পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বললাম, আমি খেয়েছি বটে। তবে রাক্ষসের মতো পাঁচ প্লেট খাইনি। এই নাও টাকা। বাসায় গিয়ে আমার টাকা যেন ঠিকঠাক ফেরত পাই।

শেষপর্যন্ত সাত টাকা পঞ্চান্ন পয়সা কম বিল দিয়ে আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। এসির ঠান্ডা বাতাস থেকে গরমে বের হয়েও বড্ড আরাম লাগছিল। বাব্বা! খেতে ঢুকেছিলাম না যুদ্ধ করতে ঢুকেছিলাম। শেষ পর্যন্ত ঘন্টু মামার শুভ বুদ্ধির উদয় না ঘটলে আজ নিশ্চিত গনধোলাই খেয়ে ফিরতে হতো। না ঘন্টু মামার সঙ্গ আমাকে ছাড়তেই হবে। তা না হলে কবে কোথায় কোন বিপদে যে পড়বো!

ঘন্টু মামা (পর্ব-৩)

রিসিপশনের মেয়েটি খটমট করে আমাদের দিকে তাঁকাচ্ছে। মেয়েটির চাহনীতে স্পষ্টত বিরক্তি। কিন্তু ঘন্টু মামার সেদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি পা নাড়ানো ও পান চিবুনো দুটোই সমানতালে চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি ঈশারা করেও তাঁকে থামাতে পারিনি। অনেকক্ষণ পান চিবোনোর পর এদিক-ওদিক তাঁকিয়ে বললেন, ধুস! এতো বড় অফিস, সব আছে অথচ পানের পিক ফেলার কিছু নেই! মানুষগুলোর কমনসেন্স নেই বললেই চলে!

আমি ফিসফিস করে বললাম, কমনসেন্স তো নেই তোমার। এতো বড় অফিসে এসে কেউ এভাবে জাবর কাটে! তোমাকে নিয়ে আর পারা গেলোনা। ওপাশে বোধহয় ওয়াশরুম আছে। যাও পিক ফেলে মুখ ধুয়ে এসো।

ঘন্টু মামা উৎসাহ নিয়ে বললেন, কী যে বলিস! পিক ফেললে পানের মজা আছে?

আমি রেগে বললাম, “তাহলে আর কী করবে! গিলেই ফেলো।”

রিসিপশনের মেয়েটি ঠোঁটে কাঠহাসি ফুটিয়ে ভেতরে যাওয়ার ইঙ্গিত করতেই আমরা উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক তখনই ঘটলো বিপত্তি। তাড়াহুড়ো করে উঠতে গিয়ে ঘন্টু মামার পা লেগে একটা বড় ফ্লাওয়ার ভাস মেঝেতে পড়ে ভেঙ্গে গেলো। ভাঙ্গার শব্দে পাশের রুম থেকে দু-জন ছুটে এলো। আমি আর ঘন্টু মামা অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঘন্টু মামা আমতা আমতা করে বললেন, স্যরি। আমি দেখতে পাইনি।

একজন মোটামতো লোক ঘন্টু মামার দিকে বিকটভাবে তাঁকিয়ে বলল, ইটস ওকে। কোথায় যাচ্ছিলেন, যান।

বিশাল রুম। চারদিকে দামী দামী আসবাব ছড়িয়ে আছে। সবগুলো জিনিসই চকচক করছে। একপাশের দেয়ালে বড় একটা পেইন্টিং। মেঝে এতোটাই স্বচ্ছ যে একটা ছোট্ট সুঁচ পড়লেও অনায়াসে খুঁজে পাওয়া যাবে। একটা বড় চেয়ারে একজন সুদর্শন লোক বসে আছেন। লোকটির বয়স বড়জোর পঁয়ত্রিশের কোটায়। কিন্তু এর মধ্যেই যে তিনি নিজেকে ঘুচিয়ে নিয়ে ভালো একটা অবস্থানে আছেন তা উনাকে দেখেই অনুমান করা যায়। তিনি ঘন্টু মামার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, কী ব্যাপার ঘনাচরন বাবু? অনেকদিন পর দেখছি। হঠাত কী মনে করে বলুন তো?
ঘন্টু মামা একগাল হেসে বললেন, আপনাকে দেখতে ইচ্ছে করছিলো। তাই চলে এলাম।

লোকটি বললেন, আপনি মশাই নিজের স্বার্থ ছাড়া কোনদিকে এক পা বাড়ান না। এবার কীসে স্পন্সর করতে হবে! বলে ফেলুন চট করে।

ঘন্টু মামা হেসে বললেন, এজন্যই আপনাকে আমার এতো পছন্দ।

লোকটি বললেন, পছন্দ করে কী করবেন! আমার বারোটা বাজানোই তো আপনার কাজ। এইতো এসেই এতো দামী একটা ফ্লাওয়ার ভাস ভেঙ্গে ফেললেন! আচ্ছা বলুন তো আপনি এতো দুর্ঘটনা প্রবন কেন?

ঘন্টু মামা লজ্জ্বিত হয়ে বললেন, কী করবো বলুন। ইচ্ছে করে তো দুর্ঘটনা ঘটাতে চাইনা। তো যে কাজে এসেছিলাম....

লোকটি ঘন্টু মামাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, এসব কাজ-টাজ পরে হবে। আগের বারের কথা আমি ভুলিনি। আমি এখন খুব ব্যস্ত। চা দিতে বলছি, খেয়ে বিদেয় হোন।

লোকটির কথায় আমি অপমানিতবোধ করছি। ঘন্টু মামার মুখ দেখে কিছু আন্দাজ করা যাচ্ছেনা। তিনি মুখে হাসি ঝুলিয়েই বললেন, কী যে বলেন! এক কাপ চা খাওয়ার জন্য এতো টাকা গাড়ি ভাড়া দিয়ে এখানে এসেছি নাকি! মান্নানের পাঁচ টাকা দামের চায়ের চেয়ে ভালো চা কী আপনার এখানে বানায়?

লোকটি বললেন, বাজে কথা রাখুন। আপনার কোন কাজে আসতে পারলাম না বলে দুঃখিত। প্লীজ আসুন।

ঘন্টু মামা রহস্যের হাসি হেসে বললেন, যেতে বললে আর কী যাওয়া যায়! আমার হাতে আপনাকে বধ করার একটা গোপন অস্ত্র আছে নিশ্চয় ভুলে যাননি?

লোকটিকে খানিকটা অপ্রস্তুত দেখালো তবে যথাসমভব গাম্ভীর্য্য বজায় রেখে বললেন, এই একটা ইস্যু নিয়ে আর কতোকাল ব্ল্যাকমেইল করবেন। এবার নতুন কিছু ভাবুন। এসব আমার কোন মাথাব্যাথা নেই।

ঘন্টু মামা মাথা চুলকে বললেন, ঠিক বলছেন তো?

লোকটি বললেন, সবকিছুর লিমিট আছে। আপনি নিজের সীমা অতিক্রম করছেন। আমি আপনার কোন বিষয়ে স্পন্সর করতে পারবোনা। গতবার আমার শিক্ষা হয়ে গেছে। টাকা গাছে ধরেনা। অনেক কষ্ট করে রোজগার করতে হয়।

ঘন্টু মামা বললেন, কী করবো বলুন! গতবার কমিটির মধ্যেই একটা গন্ডগোল ছিল। এবার কোন সমস্যা হবেনা। আপনার প্রচারনা ঠিকমতো হবে।

লোকটি বললেন, আমার কোন প্রচারনা চাইনা। দয়া করে আপনি আসুন।

ঘন্টু মামা উঠে দাঁড়ালেন। দরজা পর্যন্ত গিয়ে আবার পেছন ফিরলেন। লোকটিকে উদ্দেশ্য করে বললেন, সত্যি যাচ্ছি।

লোকটি ঘন্টু মামার কথাকে কোন পাত্তা না দিয়ে ফাইলে মনোযোগ দিলেন। ঘন্টু মামা আর আমি বেরিয়ে এলাম। বেরিয়ে আসার সময় রিসিপশনের মেয়েটি এমনভাবে আমাদের দিকে তাঁকাচ্ছিল যেন পারলে গিলে খায় আর কি!

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে আমি ঘন্টু মামাকে জিজ্ঞেস করলাম, এ কী গো! তুমি যে লোকটাকে রীতিমতো ব্ল্যাকমেইল করছিলে? কী ব্যাপার বলো তো?

ঘন্টু মামা হেসে বললেন, সে অনেক কাহিনী। তোর জেনে কাজ নেই।

আমি বললাম, কিন্তু লোকটি তো কোন স্পন্সর করবেনা। এখন কী করবে? হাতে খুব একটা সময় নেই। শীঘ্রই টিম এন্ট্রি করতে হবে।

ঘন্টু মামা আবার রহস্যের হাসি হেসে বললেন, চিন্তা করিস না। কালকের মধ্যে দেখিস ঠিকই যোগাযোগ করবে। শোন, এদিকে কোন একটা দোকানে খুব ভালো বিরিয়ানী বিক্রি করেনা? এদিকে যখন এসেছি বিরিয়ানীটা খেয়েই যাই।

এই একটা ব্যাপারে ঘন্টু মামার কোন ক্লান্তি নেই। একটু আগেই যে পরিমাণ অপমানিত হয়ে এসেছেন তারপরও একজন মানুষ এতো নির্দ্বিধায় খাওয়ার কথা বলে কীভাবে! অপমান গিলে আমার পেট এমনিতেই ভরে গেছে তবুও ঘন্টু মামার পেছনে আমাকেও ছুটতে হলো।

ঘন্টু মামা (পর্ব-২)



ঘন্টু মামার বাসাটা আমাদের পাড়ার একেবারে মধ্যিখানে। একতলা এই বাসাটি ঘন্টু মামার বাবা তৈরি করেছিলেন। অনেক শখ করে তৈরি করলেও ঘন্টু মামার বাবা এ বাসায় একটি দিনও থাকতে পারেননি। ঘর সঞ্চয় করে যেদিন বাসায় উঠবেন, ঠিক আগের দিন রাতে হার্ট এটাক করে তিনি মারা যান। এই বাসা তৈরি করার আগে ঘন্টু মামারা এ পাড়াতেই একটা ভাড়া বাসায় থাকতেন। স্বামীর শখের বাসায় স্বামী থাকতে পারেননি সেই শোকে ঘন্টু মামার মাও এ বাড়িতে উঠলেন না। পাঁচ কক্ষের বাসাটি ভাড়া দিয়ে ঘন্টু মামার মা গ্রামের বাড়িতে চলে গেলেন। ঘন্টু মামা তখন অনেক ছোট। তিনিও মায়ের সাথে গ্রামের বাড়িতে ছুটলেন। কয়েক বছর গ্রামে থেকে ঘন্টু মামা তার কাকার সাথে আবার এই বাড়িতে এসে উঠলেন। তিনি ও তার কাকা বাইরের দিকে একটা ঘরে থাকা শুরু করলেন। বাকি ঘরগুলো ভাড়াই থাকলো।

ঘন্টু মামার কাকা পড়ুয়া মানুষ। তিনি সবসময় তার পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ঘন্টু মামাকে তিনি ক্লাস সিক্সে ভর্তি করিয়ে দিলেন বটে কিন্তু ভাইপোর দিকে নজর দেয়ার মতো এতো সময় তার কোথায়! আর এই সুযোগে ঘন্টু মামা দিনকে দিন বেয়াড়া হয়ে উঠলেন। পড়াশোনা সব শিকেয় উঠলো। কোনরকমে উচ্চ মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়েছেন। বিএ তে ভর্তিও হয়েছিলেন কিন্তু সেটা চালিয়ে যাওয়ার মতো ইচ্ছা ও মানসিকতা কোনটাই ঘন্টু মামার ছিলোনা। ঘন্টু মামার কাকা নরেন পিএইচডি করার জন্য কানাডা পাড়ি জমালে ঘন্টু মামা চূড়ান্ত স্বাধীনতা পেয়ে যান।

ঘন্টু মামার মা তার মেধাবী দেবরের সাথে ঘন্টু মামাকে শহরে পাঠিয়েছিলেন এই ভেবে যে, পড়ুয়া কাকার সংস্পর্শে থেকে ঘন্টু মামাও পড়াশোনাটা ঠিকমতো চালিয়ে যাবে। কিন্তু সে গুড়ে বালি! ঘন্টু মামার মা আপাতত অদৃষ্টকে দোষ দিয়েই ক্ষান্ত হয়েছেন।

ঘন্টু মামার কাকার অনুপস্থিতিতে ঘন্টু মামার রুমটাকেই আমরা আমাদের ক্লাব ঘর বানিয়ে নিয়েছি। আসলে ক্লাব বলতে যা বোঝায় এটি সেরকম না। এখানে কোন প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারীর বালাই নেই। এটা আমাদের রাজত্ব, এখানে আমরা সবাই রাজা। তবে এটা মানতেই হবে আমাদের এই রাজত্বে ঘন্টু মামাই মূল কান্ডারী তবে কোনভাবেই তাঁকে স্বৈরাচারী বলা চলেনা। ঘন্টু মামা অনেকটা আমাদের গাইডের মতো।

আজ সন্ধ্যায় ঘন্টু মামা ক্লাবঘরে অর্থাৎ তার রুমে আমাদের সবাইকে ডেকেছেন। সচরাচর এভাবে আয়োজন করে সবাইকে ডাকা হয়না। তাই আমি অনুমান করছি কোন বিশেষ কারনে ঘন্টু মামা আমাদের আজ ডেকেছেন।

আমি আর রিজু গেট দিয়ে ঢুকতে যাবো তখন ঘন্টু মামা হাঁক দিলেন, এই মুন্না তুই এদিকে আয়। আর রিজু মান্নানের দোকানে চপের অর্ডার দেয়া আছে তুই সেগুলো নিয়ে আয়। মনে করে সঙ্গে ভাঁজা শুকনো মরিচ আনিস কিন্তু।

আমি ঘন্টু মামার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বললাম, কি ব্যাপার! সবাইকে এতো জরুরী তলব করেছো কেন?

ঘন্টু মামা রহস্যের হাসি হেসে বললেন, সবাই আসুক। জানতে পারবি।

আমার আর তর সইছিলোনা। বললাম, বলোইনা।

“আরে এতো উতলা হচ্ছিস কেন? এক কাজ কর তুই চেয়ারগুলোকে ঠিকঠাক করে রাখ। আমি ছাদ থেকে আসছি।”

ঘন্টু মামা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বসে আছে। ঘরজুড়ে পীনপতন নীরবতা। ঘন্টু মামাকে ঘিরে আমরা ছয়জন বসে আছি। সবাই অপেক্ষা করে আছি ঘন্টু মামার বক্তব্য শোনার জন্য। ঘন্টু মামা কথা বলতে যাবেন এমন সময় হাসু বলে উঠলো, চপগুলো টেবিলের ওপর থেকে সরিয়ে রাখা হোক। বারবার চপের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে।
হাসুর কথা শুনে ঘরজুড়ে হাসির রোল উঠলো। ঘন্টু মামার সিরিয়াস ভঙ্গিতেও ছেদ পড়লো। তিনি বললেন, আপনি এতো রাক্ষস কেন! নিজের লোভকে সামলে রাখতে পারেন না? সামনে খাবার থাকলেই লোভ করতে হবে নাকি!

ঘন্টু মামা হাসুকে আপনি করে সম্বোধন করছেন দেখে আমরা সবাই ভীষন আশ্চর্য্য হলাম। রিজু জিজ্ঞেস করলো, কি গো মামা! তুমি ওকে আপনি করে বলছো কেন!

“এখানে একটা সভা চলছে। সভার নিয়ম অনুসারে সবাইকে আপনি করে বলতে হয়। কাজেই সভা চলাকালীন তুমি-তুই এই ধরনের শব্দ ব্যবহার করা চলবেনা। সবাই সবাইকে সম্মান প্রদর্শন করে কথা বলতে হবে।”

আমরা মাথা নাড়লাম। তবে ব্যাপারটা বেশ মজা লাগলো। ঘন্টু মামার অগোচরে একে-অপরকে চিমটি কাটতে লাগলাম। ঘন্টু মামা গলা খাকারি দিয়ে বললেন, তাহলে সভা শুরু করা যাক।

আমরা সবাই হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়লাম। ঘন্টু মামা বলতে শুরু করলেন, আজ আমরা এখানে একটা বিশেষ কারনে মিলিত হয়েছি।

সবাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাঁকিয়ে রইলাম। ঘন্টু মামা ব্যাপারটা আঁচ করতে পেরে বললেন, আমি যতোটুকু জানি আপনাদের কারো এখন কোন পরীক্ষা বা অন্য কোন কাজ নেই। অনেক ভেবে-চিন্তে দেখলাম এই সময়টা এভাবে অলস বসে না থেকে আমরা কিছু একটা করতে পারি।

আমি বললাম, কী করা যায়?

ঘন্টু মামা বললেন, কী করা যায় আপনারা ভেবে বের করুন।

এবার সবার মধ্যে গুনগুন শুরু হলো। খানিক পরে রিজু বলল, আমরা কোথাও ঘুরে আসতে পারি?

ঘন্টু মামা বললেন, ঘুরাঘুরি আমরা অনেক করেছি। আপাতত ঘুরাঘুরি বাদ। অন্য কিছু চিন্তা করুন।

অনেক আলোচনা করেও কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যাচ্ছিলোনা। আমি এমনিতেই বললাম, আগামী মাস থেকে কাউন্সিলর কাপ সিক্স এ সাইড ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হতে যাচ্ছে আমরা তাতে অংশ নিতে পারি।

কথাটা ঘন্টু মামার মনে ধরলো। তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, প্রস্তাবটা মন্দ নয়। সবাই কি বলেন?

সাধারণত কেউ ঘন্টু মামার সিদ্ধান্তের বাইরে যায়না। কিন্তু এবার রিজু বলল, প্রস্তাবটা মন্দ নয় তবে কথা হচ্ছে আমাদের তো ভালো ব্যাট-বলই নেই খেলবো কীভাবে?

রিজুর কথার সাথে সবাই একমত। আসলেই আমাদের ভালো ব্যাট-বল নেই। হাসু বলল, আমরা সবাই চাঁদা দিয়ে ব্যাট-বল কিনতে পারি।

আমি বললাম, চাঁদা দিয়ে ব্যাট-বল হয়তো কেনা যাবে কিন্তু একটা টুর্নামেন্টে অংশ নিতে হলে এন্ট্রি ফিসহ অনেক প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। আমরা মাত্র কয়েকজন চাঁদা দিয়ে কীভাবে কী হবে? ঘন্টু মামা কী বলো?

“হু আমিও তোর কথার সাথে একমত। তুই খোঁজ নে টুর্নামেন্টের এন্ট্রি ফি কতো? আর প্রাইজমানিটা কেমন সেটাও খবর নিস।”

“শুনেছি প্রাইজমানিটা বেশ ভালোই। ইন্ডিভিচুয়ালী ম্যাচ ফির পাশাপাশি চ্যাম্পিয়ান টিমকে একটা ফ্ল্যাট টিভি পুরস্কার দেবে।”

ঘন্টু মামা চোখ কপালে তুলে বলল, বলিস কীরে! খুব বড় স্পন্সরকে বাগিয়েছে মনে হচ্ছে! অংশ নিতে পারলে ভালোই হতো। ক্লাবের জন্য একটা টিভির ব্যবস্থা হয়ে যেতো।

সবাই ঘন্টু মামার কথায় সায় দিলাম। হাসু বলল, সবই তো বুঝলাম কিন্তু টাকা-পয়সা কীভাবে ম্যানেজ হবে?

ঘন্টু মামা বললেন, এতো চিন্তা করার কী আছে! তোর আইফোনটা বিক্রি করে দিলেই তো মোটা অংকের টাকা পাবো।
হাসু ভুত দেখার মতো চমকে উঠলো সে কিছু বলতে যাচ্ছিলো পাশ থেকে আলম টিপ্পনী কেটে বললো, এভাবে হাতে হাতে বিক্রি করলে বেশী টাকা পাওয়া যাবেনা।

রিজু বললো, সমস্যা কী! এখন তো বিভিন্ন ওয়েবসাইটে বিজ্ঞাপন দিয়ে ব্যবহৃত জিনিস বিক্রি করা যায়। ওখানে অনেক ক্রেতা পাওয়া যায়। দামও বেশ ভালোই পাওয়া যায়।

হাসু অনেকক্ষন পর সুযোগ পেয়ে বলল, মোটেও আমি আমার আইফোন বিক্রি করবোনা। আমার মামা লন্ডন থেকে এটা পাঠিয়েছে।

আমি ব্যঙ্গ করে বললাম, ছি ছি হাসু! তুই আমাদের জন্য এই ছোট্ট সেক্রিফাইসটা করতে পারবি না!

হাসু মুখ কালো করেই জবাব দিল, তোর ট্যাবটাই বিক্রি করে দেসনা। ওটা বিক্রি করলেও ভালো টাকা পাওয়া যাবে।

ঘন্টু মামা এতোক্ষন চুপচাপ মজা দেখছিল। পরিস্থিতি জটিল হচ্ছে দেখে তিনি বললেন, কী শুরু করলি তোরা। আমি থাকতে তোদের চিন্তার কী আছে! তোদের কিচ্ছু বিক্রি করার দরকার নেই।

আমি বললাম, সে তো ঠিক আছে। কিন্তু গতবারের ফাংশানের কথা নিশ্চয় মনে আছে! এরপরও সহজে স্পন্সর পাবে বলে মনে করছো?

ঘন্টু মামা চিন্তিত মুখে বললেন, সেটা খানিকটা দুশ্চিন্তার বিষয়। তবে যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে ফেলবো। আর যদি ম্যানেজ নাই করা যায় তাহলে বিকল্প ভাবনা ভেবে রেখেছি।

সবাই উৎসুক হয়ে একসাথে জিজ্ঞেস করলাম, কী ভাবনা?

ঘন্টু মামা বললেন, সবগুলা একসাথে কথা বলছিস কেন! যদি কোনভাবেই স্পন্সর যোগাড় না হয় তবে সেগুন গাছটা কেটে ফেলবো।

সেগুন গাছ কাটার কথা শুনেই আমরা সবাই আঁতকে উঠলাম। শুধু ঘন্টু মামার সাথেই নয়, এ পাড়ার সাথেই সেগুন গাছটির একটি আত্মিক বন্ধন হয়ে গেছে। ঘন্টু মামার বাবা এই বাসা তৈরির সময় সামনের উঠোনে গাছটি লাগিয়েছিলেন। আজ গাছটি একটি মহীরূহ হয়ে পুরো বাড়িটাকে ছায়া দিয়ে রেখেছে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, পাগল হয়েছো নাকি! মাত্র ক’টা টাকার জন্য এতো বড় গাছ কাটবে? দরকার নেই টুর্নামেন্টে অংশ নেয়ার।

আমার কথায় সবাই সায় দিলো। রিজু বলল, এই সেগুন গাছের দাম কতো হবে জানো? কয়েক লাখ টাকা হবে। এটা কাটা হবে চূড়ান্ত বোকামী।

ঘন্টু মামা বললেন, আমি এখনই কাটবো বলছিনা। যদি টাকার ব্যবস্থা না হয় তখনই এটা কাটা যায় কিনা দেখবো। এছাড়া আমার কিছু দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা আছে। এজন্য অনেক টাকার দরকার।

আমি বললাম, পরিকল্পনাটা কী জানতে পারি?

ঘন্টু মামা বললেন, অনেক প্ল্যান করে রেখেছি। এছাড়া ক্লাবঘরের জন্য কিছু চেয়ার-টেবিল-আলমিরা বানাতে হবে। সেগুন গাছের কাঠ দিয়েই যদি তা করা যায় মন্দ কী! দক্ষ কাঠমিস্ত্রী দিয়ে আমরা কয়েকটা ভালো ব্যাট বানিয়ে নিতে পারি। এতে করে সারা বছর সবাই প্র্যাকটিসের মধ্যে থাকতে পারবে। এখন সবাই মনে মনে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করো।

ঘন্টু মামা (পর্ব-১)

আমার মায়ের সাথে কোন প্রকার আত্মীয়তার সম্পর্ক না থেকেও তিনি আমার মামা। কবে, কীভাবে যে তিনি আমার মামা হয়ে গিয়েছিলেন তা আমি নিজেও জানিনা।! আমার দেখাদেখি আমার সমবয়সীরাও তাঁকে মামা বলে ডাকা শুরু করেছিল। সেই থেকে তিনি আমাদের সবার প্রিয় ঘন্টু মামা।

ঘন্টু মামার ভালো নাম ঘনাচরণ সরকার। তবে খুব কমসংখ্যক লোকই তাঁকে এ নামে চেনে। সবার কাছে তিনি ঘন্টু নামেই বেশী পরিচিত। ঘন্টু মামা মানুষটা খুব মজার তবে অসম্ভব রকমের নরম মনের মানুষ। অন্যের দুঃখ-কষ্ট তিনি একদম সইতে পারেননা। পাড়ার গরীব অসহায় মানুষের এক অন্যতম ভরসার নাম ঘন্টু মামা। নিজে না খেয়ে হলেও তিনি অন্যের খাদ্যের ব্যবস্থা করতে মরীয়া হয়ে উঠেন।

ঘন্টু মামার আরেকটা গুণ হচ্ছে তিনি খুব সহজে মানুষের সাথে মিশতে পারেন। একেবারে অপরিচিত মানুষের সাথেও তিনি অল্প সময়ের মধ্যে মিশে যেতে পারেন। ঘন্টু মামার সাথে রাস্তায় বেরোলেই বোঝা যায় তিনি কতোটা পরিচিত! তার পরিচিতির ঠেলায় পাঁচ মিনিটের রাস্তা পেরুতে বিশ মিনিট লেগে যায়। মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলি ইলেকশানে তোমাকে দাঁড় করিয়ে দিলে তুমি অনায়াসেই পাশ করে যাবে!

এলাকার মেয়ে মহলে ঘন্টু মামার আলাদা একটা কদর আছে। কতো যুগলের প্রেম-বিরহের গল্প রচিত হয়েছে ঘন্টু মামার হাত দিয়েই। পাড়ার উঠতি ছেলেরা ঘন্টু মামা বলতেই অজ্ঞান। ঘন্টু মামাকে বাদ দিয়ে পাড়ার কোন ধরনের খেলাধুলা বা ফাংশনের কথা চিন্তাই করা যায়না। খেলাধুলা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের স্পন্সর যোগাড় করা সহ সব আয়োজনের অগ্রসৈনিক আমাদের প্রিয় ঘন্টু মামা।

জয়াদির সাথে ঘন্টু মামার এক বিশেষ ধরনের সম্পর্ক আছে। আমি আর আমাদের কাছের কয়েকজন ছাড়া এ বিষয়ে কেউ একটা জানেনা। ঘন্টু মামাও ঢাক-ঢোল পিটিয়ে সবাইকে জানাতে আগ্রহী না। ঘনাচরণ সরকার ওরফে ঘন্টু মামাকে আমি যেহেতু মামা বলে ডাকি সেহেতু উনার প্রেমিকাকে আমার মামী বলে সম্বোধন করা উচিত। কিন্তু এখানে ছোট্ট একটা গন্ডগোল আছে। গন্ডগোলটা বাঁধিয়েছেন ঘন্টু মামা স্বয়ং। আমার পাড়াতুতো সুন্দরী দিদির সাথে ঘন্টু মামা প্রেম করলে আমার কী করার আছে! জয়াদিকে ছোটবেলা থেকেই দিদি ডেকে অভ্যস্ত; এখন হঠাত করে মামী বলে ডাকি কেমন করে?

ঘন্টু মামা আর আমি হরিহর আত্মা। ঘন্টু মামা যেখানে আমি আছি সেখানে। আর যেহেতু আমি সবসময় উনার সাথে ছায়ার মতো সেঁটে আছি কাজেই ঘন্টু মামার অনেক অজানা কাহিনীরও প্রত্যক্ষদর্শী আমি।

অনেকদিন থেকেই আঁচ করছিলাম জয়াদি আর ঘন্টু মামার মধ্যে কিছু একটা ঘটতে চলেছে। রাস্তা বা অন্য কোথাও যখন দুজন একে-অপরের মুখোমুখি হতেন তখন তাদের অঙ্গভঙ্গিই বলে দিতো ডাল ম্যা কুচ কালা হ্যায়! প্রানোচ্ছ্বল, মিশুক আর সদা হাসোজ্জ্বল ঘন্টু মামাকেও দেখতাম কেমন জানি চুপসে যেতেন। জয়াদির সাথে কথা বলতে গেলেই ঘন্টু মামার কথা জড়িয়ে যেতো; জয়াদির মুখোমুখি হলে ঘন্টু মামার কথা শুনে যে কেউ মনে করবে কোনকালে ঘন্টু মামার তোতলানোর অভ্যাস ছিল। জয়াদিকে ঘন্টু মামার মতো এতোটা অপ্রস্তুত না দেখালেও স্পষ্টত বুঝা যেতো উনার মধ্যেও কিছু একটা ঘটছে। তবে জয়াদি তার স্বভাবসুলভ সুন্দর হাসি দিয়ে পুরো পরিস্থিতিটা সামলে নিতেন। এভাবেই অনেকদিন চলছিলো। কেউ আগ বাড়িয়ে মনের কথা খুলে বলতে পারছিলো না।

সে প্রায় বছর দেড়েক আগের কথা। একদিন বিকেলে জয়াদি তার কাকাতো ভাই দেবাকে দিয়ে আমাকে ডেকে পাঠালেন। জয়াদি আমায় ডেকেছেন শুনে আমি বিষ্মিত হলাম। দেবা নিতান্তই একটা বাচ্চা ছেলে। ওকে কারনটাও জিজ্ঞেস করতে পারছিলাম না। ভাবলাম ঘন্টু মামাকে একটা ফোন দেবো কিনা! পরক্ষণেই মনে হলো গিয়েই দেখি না কি ব্যাপার!

আজকাল জয়াদি খানিক রাগী রাগী হয়ে গেলেও তখন মোটেও রাগী ছিলেন না। তবু আমার কেন জানি ভয় ভয় করছিলো। আসলে অতিরিক্ত সুন্দরী জয়াদির আচরনে এমন একটা গাম্ভীর্য্য ছিল; যে কেউ তাঁকে সমীহ করে চলতে বাধ্য। আমি ভীরু ভীরু পায়ে জয়াদির বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হলাম। এর আগেও আমি এ বাড়িতে কত্তো এসেছি। কখনো এতোটা ইতঃস্তত লাগেনি।

দরজায় নক করতেই জয়াদি দরজা খুলে দিলেন। ড্রয়িং রুমে প্রবেশ করতেই দেখলাম ঝর্না কাকীমা টিভিতে কী একটা অনুষ্ঠান দেখছেন। আমাকে দেখে বললেন, আরে মুন্না! তুই কোত্থেকে! আজকাল তো  তোকে দেখাই যায়না! বেশ বড় হয়ে গেছিস দেখছি। তা এবার কোন ক্লাসে উঠলি?

আমি বুক চিতিয়ে জবাব দিলাম, ইন্টারমিডিয়েট ফার্স্ট ইয়ারে পড়ছি।

কাকীমা অবাক হয়ে বলল, বলিস কীরে! সেদিনও তো দেখতাম তোর মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেতিস। বাব্বা! তোরা সবাই কতো তাড়াতাড়ি বড় হয়ে গেলি! কোন কলেজে এডমিশন নিয়েছিস?

আমি উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম। জয়াদি থামিয়ে দিয়ে বলল, মা কি শুরু করেছো? আসার পর থেকেই ওকে জেরা করে চলেছো! এই মুন্না আমার ঘরে চল।

আমি জয়াদির পিছু পিছু জয়াদির রুমে হাজির হলাম। রুমে ঢুকেই আমার বিষ্ময় আকাশ স্পর্শ করলো। পুরো ঘরের দেয়াল পার্পল রঙের ইমালশন রঙ দিয়ে রাঙ্গানো। দরজার বাঁ-পাশে দুটি আলমিরা ভর্তি বই আর বই। এক পলকে চোখ বুলিয়ে দেখলাম নামী-দামী লেখকের বইয়ে আলমিরা ঠাসা। আলমিরার পাশে দেয়ালে সারি করে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শেকসপীয়ার, ম্যাক্সিম গোর্কী, বঙ্গবন্ধু, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের ছবি ঠাঙ্গানো।

ডানপাশে একটা হোম থিয়েটার সেট করা হয়েছে। হোম থিয়েটারের পাশেই দুটো সেলফভর্তি হরেক রকম ডিভিডি। ঘরের ঠিক মাঝখানে শুভ্র সাদা চাদর বিছানো একটা খাট। বালিশের উপর আধখোলা ল্যাপটপ। খাটের পাশে টেবিলে ছড়ানো কয়েকটি কাগজের টুকরো। মেঝেজুড়ে বিছানো মখমলের কার্পেট। পুরো ঘরের মধ্যে যেন একটা সুভাষ ছড়ানো। আমার কাছে মনে হচ্ছিলো আমি কোন স্বর্গালোকে প্রবেশ করেছি। বিষ্মিত হয়ে জয়াদিকে বললাম, এ কী গো! আমার তো মনে হচ্ছে আমি এক ভিন্নজগতে এসে পড়েছি।

জয়াদি মৃদু হাসলো। আমার ঘোর তখনো কাটছেনা। আমি বললাম, এই বইগুলো কী তুমি পড়? এই ডিভিডিগুলোও কি তোমার?

জয়াদি বলে, তোর কি মনে হয়?

আমি বললাম, ঘরটাকে তো পুরো স্বর্গ বানিয়ে রেখেছো।

জয়াদি মৃদু হাসলো। তারপর বলল, তুই বস। আমি তোর জন্য কিছু খাবার নিয়ে আসি।

জয়াদি পাশের ঘরে চলে যেতেই আবার বুকে ধুকপুকানি শুরু হলো, জয়াদি কেন আমায় ডেকে পাঠালো!

খানিক পরেই জয়াদি একপ্লেট সন্দেশ আর এক গ্লাস পানি নিয়ে ঘরে ঢুকলো। আমার সামনে প্লেট রেখে বলল, নে খা।
আমি বললাম, পাগল হয়েছো এতো সন্দেশ খাবো কী করে?
যতোটা পারিস খা। বাকিগুলো তোর গুরুদেব ঘনাচরণের জন্য নিয়ে যাস।

সন্দেশগুলো খাঁটি গরুর দুধ থুক্কু গরুর খাঁটি দুধের ক্ষীর দিয়ে তৈরি। বেশ মজা করে তিনটে সন্দেশ খেয়ে নিলাম। প্লেটে পড়ে রইলো আরো তিনটে সন্দেশ। সন্দেশগুলো এতোটাই সুস্বাদু যে ইচ্ছে করছিলো আরো দু-একটা খেতে। তবে ইচ্ছেকে দমন করলাম কেননা বেশী খেলে জয়াদি আবার আমাকে রাক্ষস ভেবে বসতে পারে।

ঢক ঢক করে পানির গ্লাস শেষ করতেই জয়াদি বলল, তোকে আজ একটা কাজে ডেকেছি।

আমি জিজ্ঞাসু চোখে জয়াদির দিকে তাঁকালাম। জয়াদি ভাঁজ করা একটা সাদা কাগজ আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এটা তোর ঘন্টু মামাকে দিবি।

আমি মনে মনে এরকম কিছুই আন্দাজ করছিলাম। আমি বাধ্য ছেলের মতো কাগজটা বুক পকেটে ভরে উঠে দাঁড়ালাম। জয়াদিকে খানিকটা লজ্জ্বিত দেখাচ্ছে। আমি পরিবেশ স্বাভাবিক করার জন্য বললাম, তুমি কোন চিন্তা করোনা। আমি ঠিকঠাক ঘন্টু মামার কাছে পৌছে দেব।

জয়াদি আমাকে সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিলো। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় জয়াদি পেছন থেকে বলল, মুন্না আর কাউকে কাগজটি দেখাস নে আমার লক্ষী ভাই। আমি একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে তড়তড় করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম।

জয়াদির বাসা থেকে বেরিয়ে বুঝলাম আমার ছোট্ট পকেটে চিঠিখানা বড্ড ভারী হয়ে গেছে। যার জিনিস তার হাতে পৌছে না দেয়া পর্যন্ত শান্তি পাবোনা। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। এখন মান্নানের চা স্টলে গেলেই ঘন্টু মামাকে পেয়ে যাবো। তাই সোজা মান্নানের চা স্টলের দিকে রওয়ানা দিলাম।

মান্নানের চা স্টলের কাছাকাছি পৌছতেই মান্নানের স্পেশাল আলুচপের গন্ধ নাকে ভেসে এলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মান্নানের স্পেশাল আলুচপ খাওয়ার জন্য দূর-দূরান্তের মানুষ ভীড় জমায় এ পাড়াতে। এ পাড়ার অনেক রহস্যের মধ্যে মান্নানের স্পেশাল আলুচপ আরো একটা গুরুতর রহস্য। আর দশটা দোকানের প্রচলিত আলুচপ থেকে এর স্বাদ ও আকৃতি সম্পূর্ন ভিন্ন ধরনের। ঘন্টু মামা মান্নানকে পটিয়ে এই স্পেশাল আলু চপ তৈরির কলাকৌশল জানার অনেক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই তাঁকে আশাহত হতে হয়েছে। মান্নান কোনভাবেই তার ব্যবসায়িক রহস্য ফাঁস করতে রাজী নয়। ঘন্টু মামা একবার ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, আমি তোর আলুচপের সেম্পল বিএসটিআই এ পাঠাবো। না জানি কি সব বিষ-টিষ সবাইকে খাওয়াচ্ছিস! পরীক্ষা করে যদি পাওয়া যায় উল্টোপাল্টা কিছু মিশিয়ে আলুচপ তৈরি করিস তাহলে কিন্তু সোজা চৌদ্দ শিকের ভেতরে পাঠাবে। বিয়ে না করেও শ্বশুরবাড়ি দেখে আসবি। তবে কোন প্রকার ভয় দেখিয়েও লাভ হয়নি, মান্নান তার আটাশখানা দাঁত কেলিয়ে সব হুমকি বাতাসে ঊড়িয়ে দিয়েছে।

এখন মান্নানের ব্যবসার পিক আওয়ার। দোকানে মানুষ গিজগিজ করছে। চারটে বেঞ্চের সবগুলোই বহিরাগত মানুষের দখলে। চা স্টলের বাইরের দিকে একটা বেঞ্চে ঘন্টু মামা আর রাজু বসে আছে। ঘন্টু মামার এক হাতে আলু চপ, আরেক হাতে আরেকহাতে চায়ের কাপ। তিনি আলুচপে একটা কামড় বসিয়ে মান্নানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বিষ-টিষ যাই মেশাশ না কেনো রে ভাই, তোর এই আলুচপ না খেয়ে একটা দিনও কাটাতে পারবোনা। ধন্যি তোর মায়ের পেটের।

মান্নান অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, চপ তৈরি করছি আমি আর ধন্যি আমার মায়ের পেটের কেন?

ঘন্টু মামা চায়ের কাপে এক চুমুক দিয়ে বললেন, আরে গাড়ল এটাও বুঝলি না। যে মায়ের ছেলে এমন অমৃত বানাতে পারে তার পেটকে ধন্যি না দিয়ে উপায় আছে!

ঘন্টু মামা আলুচপে আরেকটা কামড় দিতে যাচ্ছিলেন তখন আমি উনার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তোমার সাথে জরুরী কথা আছে। একটু উঠে এসো।

ঘন্টু মামা চপে মজে আছে, আমার কথা শোনার সময় কোথায়! আমাকে বসার ইঙ্গিত দিয়ে বললেন, ওসব কথাটথা পরে হবে, আগে একটা আলুচপ খেয়ে নে।

আমি রাগ দেখিয়ে বললাম, তোমার শুধু খাওয়া আর খাওয়া! তুমি এতো পেটুক কেন?

ঘন্টু মামা হো হো করে হেসে উঠলেন। জগতে খাওয়া ছাড়া আর কি আছে বল! তার ওপর মান্নানের স্পেশাল আলুচপ হলে তো আর কথাই নেই।

উত্তেজনায় আমার হার্টবিট এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে; আর চাপ সামলাতে পারছিলাম না। জয়াদি বলে দিয়েছে আর কেউ যেন না দেখে তাই সবার সামনে চিঠিখানা দিতেও পারছিনা। আমি আকুতির স্বরে বললাম, প্লীজ একটু আসবে। খুব জরুরী দরকার।

মুখ কাঁচুমাচু করে বলায় কাজ হলো। ঘন্টু মামা উঠলেন। মান্নানকে বললেন, ওই আরো দুইটা চপ ভালো করে ভেজে রাখ। আমি আসছি।

ঘন্টু মামা আর আমি দোকানের পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আবছা অন্ধকারে ঘন্টু মামার হাতে কাগজটি তুলে দিলাম। কাগজ হাতে নিয়ে ঘন্টু মামা জিজ্ঞেস করলেন, কী এটা?

আমি উৎফুল্ল হয়ে বললাম, খুলেই দেখোনা।

ঘন্টু মামা তার বিখ্যাত নোকিয়া ১১০০ মডেলের সেটখানা বের করে টর্চ লাইটের আলো জ্বেলে কাগজে চোখ রাখলেন। অন্ধকারে ঘন্টু মামার মুখের মানচিত্র ঠিক বুঝা যাচ্ছিলোনা। বেশ খানিকক্ষণ মৌন থাকার পর ঘন্টু মামা নীরবতা ভাঙ্গলেন, অ্যাইরে! যা আন্দাজ করেছিলাম শেষ পর্যন্ত তা সত্যি হয়ে গেলো দেখছি!

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি খুশী হওনি?

ঘন্টু মামা বললেন, এতে খুশী হওয়ার কি আছে? বুঝলি এসব প্রেম-ট্রেম আমার জন্য না। জয়াকে তো বুদ্ধিমতী মেয়ে বলেই জানতাম। ও এমন কান্ড করে বসবে বুঝতে পারিনি!

আমার খুব রাগ হতে লাগলো। ভাব নিচ্ছো, তাইনা? এখন সব দোষ জয়াদির! জয়াদি সামনে এলে তোমার অবস্থা কি হয় সে আমার দেখা আছে। নিজে আগ বাড়িয়ে প্রপোজ করার মুরোদ তো নেই ই। উলটো আরেকজনকে দোষারোপ করছে!

ঘন্টু মামা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুই এতো রাগ করছিস কেন?

আমি রাগ করবো কেন! আমি তোমার ভাব নেওয়া দেখে বিষ্মিত হচ্ছি মাত্র। তোমার সাত জন্মের ভাগ্য জয়াদির মতো ধনীর দুলালী তোমাকে আগ বাড়িয়ে প্রপোজ করেছে।

ঘন্টু মামা হো হো করে হেসে উঠলেন, জয়া তোকে কতো ঘুষ দিয়েছে বলতো? সেই কখন থেকে ওর হয়ে ওকালতি করেই যাচ্ছিস!

ধুর বাবা আমার কী! আমি তো শুধু চেয়েছি তোমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হোক। আচ্ছা সত্যি করে বলো তো তুমি জয়াদিকে ভালোবাসোনা? তোমার উত্তর না হলে আমি এখনই জয়াদিকে জানিয়ে আসবো।

ক্ষেপেছিস! ঘরের লক্ষী পায়ে টেলতে আছে! আমি জীবনেও ওকে আগ বাড়িয়ে ভালোলাগার কথা বলতে পারতাম না। এখনই তো ওর চোখের দিকে ভালো করে তাঁকাতে পারিনা; এরপর তো আর তাঁকাতেই পারবোনা

কেন জয়াদির চোখে বিজলী আছে নাকি যে তাঁকালে তোমার চোখ ঝলসে যাবে!

বিজলী বলিস কীরে! বল এটম বোমা! ওই চোখে তাঁকালেই বুকে বিস্ফোরন শুরু হয়ে যায়।

ভালোই তো। হ্যাঁ বলে দাও চট করে।

অনেক সমস্যা আছে

সমস্যার দোহাই দেয়া তোমার মানায় না।

দেখ এ জীবনে এ পাড়ার কতো জনেরই প্রেম-বিরহের গল্প আমার হাত দিয়ে লেখা হয়েছে। তাতে করে বুঝেছি প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে একটা দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার জায়গা তৈরি হয়ে যায়। নিজের মধ্যে রেসপনসিবিলিটি না থাকলে একটা সম্পর্কের ভার বহন করে চলা খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। জবাবদিহিতা নিয়ে আমার কোন সমস্যা নেই। আসল সমস্যা হলো রেসপনসিবিলিটি। আমি আমার নিজেকে তো চিনি তাই যতো দুশ্চিন্তা।

ঘন্টু মামার কথা শুনে আমি চূড়ান্ত বিষ্মিত। আমি বললাম, এ কী গো মামা! তুমি এতো জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বলছো যে!

জ্ঞানী জ্ঞানী কথা বললাম কোথায়? এটা হচ্ছে প্র্যাক্টিক্যাল জ্ঞান। চোখের সামনে অনেককেই তো দেখছি তাই বললাম।

আমি এতোকিছু বুঝতে চাইনা। তোমাদের মধ্যে একটা সম্পর্ক হচ্ছে এটাই ফাইনাল কথা। আমি কালকেই জয়াদিকে বলে দেবো তুমি উনার প্রস্তাব গ্রহন করেছো। এবার চলো মান্নানের স্পেশাল আলুচপ খাওয়াবে।

যাই হোক এভাবেই ঘন্টু মামা আর জয়াদির মধ্যে একটা সম্পর্ক হয়ে গিয়েছিল। গত দেড় বছর থেকে দেখছি ওরা দুজন ভালো-মন্দের মাঝামাঝি একটা অবস্থানে বেশ কাটিয়ে দিচ্ছে। জয়াদি প্রতিনিয়ত ঘন্টুমামাকে ঘরমুখো রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু কোন প্রচেষ্ঠাই কাজ দিচ্ছেনা। ঘন্টু মামা আছেন ঘন্টু মামার মতো। যদিও অনেকের কাছেই ঘন্টুমামার কাজকর্ম নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। তবে আমাদের কাছে ঘন্টু মামা ইজ দ্য বস। ঘন্টু মামাকে বাদ দিয়ে আমরা কোন কাজের কথা চিন্তাই করতে পারিনা।

সোমবার, ১ ডিসেম্বর, ২০১৪

শেষরাতের বৃদ্ধ

মধ্যরাত। সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত পৃথিবী গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশন ধরে ছুটছে রাতের ট্রেন। কখনোবা মাঠ, কখনোবা বনের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে হুইসেল বাজাতে বাজাতে। আর ট্রেনের যাত্রীরা সবাই বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। একজনের মাথা আরেকজনের ঘাড়ে পড়ছে তো অপরজন আবার ঘুমের মধ্যেই তা ঠেলে দিচ্ছে। সবাই যেন নিজের বেডরুমে আরামসে ঘুমাচ্ছে। শুধু আমার চোখেই ঘুম আসছেনা।

ট্রেন যখন সিলেট স্টেশনে এসে থামল তখন শেষরাত। শীতের চাদরে ঢাকা নিস্তব্ধ স্টেশন ক্ষনিকের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটু আগেও যারা গভীর ঘুমে নিমগ্ন ছিল তারা সবাই জেগে উঠেছে। সবাই যার যার গন্তব্যস্থলে চলে যাচ্ছে। রাস্তাঘাট ভীষন ফাঁকা থাকায় আমার একা একা যেতে ভয় করছিল। অনেকক্ষন রিকশার অপেক্ষা করলাম,কিন্ত কোন রিকশা পেলাম না। একবার চিন্তা করলাম বাকি রাতটা স্টেশনেই কাটিয়ে দেই। কিন্ত পরমূহুর্তেই চিন্তা করলাম এখানে ভালো মানুষ থেকে খারাপ মানুষের সংখ্যাই বেশী, কাজেই এখানে থাকা উচিত হবেনা।

রাস্তার সোডিয়াম বাতিগুলো যেন নিভু নিভু করছে। সোডিয়ামের আলোতে রাতের সিলেটকে একেবারে অন্যরকম লাগছে! সোডিয়ামের হলুদ-সোনালী মেশানো আলো আর শেষ রাতের কূয়াশার খেলায় সবকিছু এক অন্যরকম রূপ নিয়েছে! যদি ভয়ে রাস্তায় না নামতাম তবে এ রকম দৃশ্য থেকে বঞ্চিত হতাম! কয়েকদিন থেকে শীতটাও বেশ পড়েছে। আজকে বরং একটু বেশীই পড়েছে।

রাতের রাস্তায় আমার সবচাইতে ভয় করে কুকুর। কেননা আমি যখন ক্লাশ ফোরে পড়ি তখন একটি পাগলা কুকুর আমাকে কামড়ে দিয়েছিল। সেই থেকে আমি কুকুর হতে ১০০ হাত দূরত্ব বজায় রাখি। কথায় আছেনা যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই রাত হয়। হাটতে হাটতে যেই না কীনব্রীজের কাছে পৌছেছি অমনি একপাল কুকুর আমায় ঘিরে ধরল। জনমানবহীন রাস্তায় নিজেকে ভীষন বিপন্ন বোধ করলাম। ঘেউ ঘেউ করে আমাকে আরো ভয়ার্ত করে ফেলছিল। তাড়াতে চাইলে আরো বেশী ভয় দেখায়। তাদের মনোভাবে মনে হচ্ছিল আমাকে দিয়েই তারা শেষরাতের ভোজন সারতে চায়! এমন অবস্থায় নিজের করনীয় কি বুঝতে পারছিলাম না। কুকুর তাড়া করলে দৌড় দেওয়াও উচিত নয়। এতে ওরা আরো ক্ষেপে যায়।

হঠাত কুকুরগুলোর হাত থেকে আমাকে বাঁচাতে দেবদূতের মতো হাজির হলেন এক জীর্ণশী্র্ণ বৃ্দ্ধ! পরনে একটি প্রিন্টের লুঙ্গী আর পাতলা গেঞ্জী। লুঙ্গীটি ভীষন ময়লা এবং গেঞ্জীর বেশীর ভাগ ছেঁড়া। প্রচন্ড শীতে তিনি কাঁপছেন।

আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এই যে তিনি কুকুরগুলোকে তাড়াতেই ওরা আর কোন ডাকাডাকি না করে একপাশে সরে গেল। আমি আশ্চর্য্য হয়ে বললাম, কি আশ্চর্য্য! আপনি তাড়াতেই কুকুরগুলো সরে গেল?
তখন বৃ্দ্ধ লোকটি বললেন, সব প্রাণীই তার স্বজাতি্র মূল্যায়ন করে শুধুমাত্র মানুষই তার ব্যতিক্রম।
আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম, কুকুর আপনার স্বজাতি!

বৃ্দ্ধ লোকটি প্রচন্ড শীতে কাঁপছেন যেন গলা দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছেনা। তারপরও গলায় যতটা সম্ভব দৃঢ়তা এনে বললেন, স্বজাতি নয়তো কি? ওরা রাস্তায় থাকে, আমিও রাস্তায় থাকি। ওরা ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খায়, আমাকেও সময় বিশেষে তাই করতে হয়। তাহলে আমার আর কুকুরের মধ্যে তফাতটা কি? বৃ্দ্ধের চোখ জলে ভরে ওঠে।

আমি যেন আমার সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। আমার মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছেনা। কীইবা জবাব আছে এ ছিন্নমূল বৃ্দ্ধের প্রশ্নের?

প্রচন্ড শীতে বৃদ্ধের চামড়া যেন জীর্নশীর্ন দেহের সাথে আরো সেঠে গেছে। আমার কাছে মনে হচ্ছিল এ রকম ঠান্ডায় গরম কাপড় না পরলে আজ রাতই হয়তো এ বৃ্দ্ধের শেষ রাত হবে। আমি আমার জিন্সের জ্যাকেটটি তার দিকে এগিয়ে দিলাম। তিনি যেন খানিকটা অবাক হলেন। আমি বললাম, আপনি শীতে কাঁপছেন,দয়া করে এটা গায়ে দিন।

তিনি এটা নিতে নারাজ। বললেন, বাবা, আমি এটা নিতে পারব না। আমার ঘরবাড়ি না থাকতে পারে, কাউকে দয়া করার সামর্থ্য আমার না থাকতে পারে, কিন্ত আমি কারো প্রতি নির্দয় হতে পারব না।
আমি অবাক হয়ে বললাম, আপনি নির্দয় হচ্ছেন কীভাবে?

তিনি বললেন, বাবা এগুলো আমার গা সওয়া হয়ে গেছে। এ ঠান্ডা আমার কিছু করতে পারবে না। কিন্ত আমি এ জ্যাকেটটা নিলে তোমার ঠান্ডা লাগবে, অসুখ হবে, তোমার কষ্ট হবে। বৃ্দ্ধের চোখ ছলছল করে উঠে।

তিনি চোখ মুছতে মুছতে আবার বলেন, বাবা, আমি বৃদ্ধ মানুষ, আজ আছি তো কাল নেই। এ সমাজ আমার কাছ থেকে আর কিছু চায় না। কিন্ত এ সমাজে তোমাদের মতো যুবকদের অনেক প্রয়োজন।

এবার আমি আমার চোখের জল আটকে রাখতে পারিনা। শেষরাতে রাস্তায় কারো কাছ থেকে এমন স্নেহ আমি কল্পনাই করতে পারিনি। বৃ্দ্ধ লোকটি নিজে মরতে রাজী আছেন কিন্ত অন্যকে চোখের সামনে মরতে দিতে রাজী নন। কতটা নিস্বার্থ হলে পরে একজন মানুষ এমন হতে পারে।অনেক কাকুতি মিনতি করে আমি তাকে জ্যাকেটটি পরিয়ে দিলাম। বৃদ্ধের চোখে এই মাঘ মাসেও যেন শ্রাবনের অঝোর ধারায় বৃষ্টি নেমেছে।

বৃদ্ধের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ব্রীজের ওপর দিয়ে নদী পার হচ্ছি, আর মন বলছে এখন যদি এই ব্রীজটা ভেঙ্গে যেত তবে সোজা গিয়ে পড়তাম ওই সুরমার বুকে। তাহলে আর দেখতে হতোনা এমন হৃদয় চুরমার করে দেওয়া দৃশ্য। হাটছি আর মনে পড়ছে একটি প্রবাদ, গাছ সবাইকে ছায়া দেয়, এমনকি কাঠুরেকেও। আর বৃদ্ধরাই হচ্ছে আমাদের এ গাছ। অথচ এ গাছে আমরা না দিচ্ছি পানি, না নিচ্ছি কোন যত্ন!!!!!!!!

বৃষ্টিকন্যা

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। আষাঢ়ের প্রথম হওয়ায় বৃষ্টির সাথে হালকা ঝড়ো বাতাসও বইছে। টিনের চালে বৃষ্টির পানি বর্ষিত হওয়ার সময় এক মধুময় শব্দ হচ্ছে। বৃষ্টির এই টাপুর-টুপুর শব্দ এমনই মাদকতায় আচ্ছ্বন্ন , যে ইচ্ছে করে ঝুম বৃষ্টিতে ভিজতে। কিন্তু মায়ের কড়া বারণ বৃষ্টিতে ভেজা যাবেনা। এমন মনোহারা বৃষ্টিস্নাত দুপুরে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে পারলে অনেক ভালো লাগতো। কিন্ত বিদ্যুৎ সেই যে গেছে আর আসার নামটি নেই। কাজেই একপ্রকার বাধ্য হয়ে জানালার পাশে বিছানায় বসে রইলো প্রিয়ন্তি। সে একদৃষ্টে বাইরে চেয়ে রয়েছে।

সদ্য বেশ কয়েকটি কচুগাছ জানালের পাশের ঝোপমতো স্থানে গজিয়েছে। চাল থেকে বৃষ্টির পানি কচুপাতার ওপর পড়েই নিমিষে চারদিকে গোলাকৃ্তি হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। পাতাগুলো দেখলে বুঝাই যায়না এইমাত্র এগুলোতে পানি পড়েছিলো। দৃশ্যটা বেশ মনোযোগ দিয়ে দেখছিলো প্রিয়ন্তি। সে কিছুটা অবাকও হচ্ছিলো এইভেবে, অন্যগাছ থেকেও পানি পড়ছে কিন্ত এতো তাড়াতাড়ি এভাবে গোল হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছেনা। 

হঠাৎ প্রিয়ন্তির মনে পড়লো সে দিন ক্লাসে পরাগ স্যার পানির পৃষ্ঠটান নিয়ে কি একটা লেকচার দিয়েছিলেন। সেখানে এরকম কি একটা ব্যাপার ছিলো। কিন্ত মনে আসছিলো না। পেটে আসছে, মুখে আসছে না এইরকম অবস্থা। সে টেবিল থেকে পদার্থ বিজ্ঞানের বই নিয়ে খুঁজে পেলো পৃষ্ঠটানের তত্ত্বটি।
তত্ত্বটি হচ্ছে“কোন কঠিন পৃষ্ঠের উপর তরল পদার্থ পড়লে দেখা যায় যে,তরলটি পৃষ্ঠের সর্বত্র ছড়িয়ে না পড়ে ফোঁটার আকার ধারণ করতে চায়। স্বল্প আয়তনের তরল পদার্থ সর্বদাই গোলকের আকৃ্তি গ্রহণ করে। এজন্যই শিশির বিন্দু, বৃষ্টির ফোঁটা, পারদ বিন্দু ইত্যাদির আকৃতি গোলাকার, কেননা নির্দিষ্ট আয়তনের তরলের মুক্ত তলের ক্ষেত্রফল গোলক আকৃ্তিতে সর্বনিম্ন হয়। সে কারণেই তরলবিন্দু আপনা থেকেই এমন জ্যামিতিক আকার গ্রহণ করে যেখানে ক্ষেত্রফল সর্বাপেক্ষা কম হয়।“
ক্লাসে পড়ার সময় ব্যাপারটা একটুও মাথায় ঢুকেনি। অথচ বাস্তবে প্রমাণ পেতেই পুরো বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেলো। এখন আর সহজে এই তত্ত্বটা মাথা থেকে হারিয়ে যাবেনা। আসলে তত্ত্বীয় পড়াশোনার চেয়ে ব্যবহারিক পড়াশোনাটা অনেক বেশী কার্যকর।

বৃষ্টির বেগ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এমন মাদকতাময় বৃষ্টিস্নাত দুপুরে প্রাণখুলে গাওয়া উচিত বৃষ্টির জয়গান। জীবনে প্রথমবারের মতো গান গাইতে না পারায় ওর আফসোস হলো। বিদ্যুৎ চলে আসতেই প্রিয়ন্তি ডিভিডি প্লেয়ারে ছেড়ে দিলো রবীন্দ্র সংগীত।

আজি ঝর ঝর মুখর বাদরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন মন লাগে না ।।
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে উদ্ভ্রান্ত মেঘে মন চায়
মন চায় ঐ বলাকার পথখানি নিতে চিনে ।।
মেঘমল্লারে সারা দিনমান
বাজে ঝরনার গান ।
মন হারাবার আজি বেলা, পথ ভুলিবার খেলা- মন চায়
মন চায় হৃদয় জড়াতে কার চিরঋণে ।।

কবিগুরুর এই গান শুনতে শুনতে প্রিয়ন্তি এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যায়। মনটা যেন উদাস হয়ে যায়। আবারো ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভিজতে। ইচ্ছে করে বৃষ্টির আহবানে বেরিয়ে পড়তে। এবার ভীষন রাগ হয় মায়ের উপর। শরীর খারাপ করলে ওর করবে উনার কি! প্রিয়ন্তি মাকে মনে মনে কিছুক্ষণ বকাঝকাও করলো, “এই দুষ্টু মেয়ে জ্বর আসলে আমার আসবে তোমার তাতে কি! আমি কি তোমাকে কিছুতে বারণ করি, তাহলে তুমি কেন এমন করো! তারপর বকাঝকা বন্ধ করে লক্ষী মেয়ের মতো মনে মনে বলে, “মা বৃষ্টিতে একটূ ভিজতে দাওনা”।

প্রিয়ন্তি মায়ের অনুমতির অপেক্ষা না করে চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে। তাদের এই শহরটা অনেকটা গ্রাম্য আদলে তৈরি। ছোট ছোট টিলা আর গাছগাছালির সমাবেশ চারপাশে। ওদের বাড়িটাও শহরের একেবারে শেষপ্রান্তে। বাড়ির পেছন দিয়ে বেরুলে শহরের অস্তিত্ব আর থাকেনা। একপাশে নিচু জমি আর আরেকপাশে ছোট টিলা।

প্রিয়ন্তি হলুদ ডোরাআঁকা লাল শাড়ি পড়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলেছে। প্রবল বৃষ্টিতে ও পুরোপুরি ভিজে গেছে। ভেজা শাড়ি গায়ের সাথে লেপ্টে শরীরের কারুকার্যময় গোপন ভাঁজগুলো দেহময় ফুটিয়ে তুলেছে। কিন্তু সেদিকে প্রিয়ন্তির কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। সে রাস্তার কাদামাটি মাড়িয়ে ছুটে চলেছে। কাদামাটি পায়ে লেগে দেখতে অদ্ভুত লাগছে। বৃষ্টির ছোঁয়া ওকে মাতাল করে দিয়েছে। পাশ দিয়ে যাওয়া একটি লোক লোলুপ দৃষ্টিতে ওর দিকে তাঁকাচ্ছে। লোকটির খারাপ চাহনী প্রিয়ন্তির বুঝতে কষ্ট হলোনা। সে দ্বিগুন উৎসাহে আরো জোরে জোরে হাটতে লাগলো। কাদা-পানি লোকটির শরীরে পড়তেই লোকটি বিরক্ত হয়ে পালালো।
রাস্তা পেরিয়ে একটি বাড়ির পুকুর পাড়ে এসে দাঁড়ালো। সারি সারি সুপারি আর নারকেল গাছ পুকুরটাকে পর্দা দিয়ে রেখেছে। পুকুরের পানিতে বৃষ্টি পড়ে অদ্ভুতভাবে নেচে উঠছে। ভীষণ ভালো লাগছে দেখতে। হাওয়ায় ভেসে এলো ইলিশ ভাজার গন্ধ। কেউ হয়তো আয়েশ করে খিচুড়ি আর গরম গরম ইলিশ ভাজা খাচ্ছে। হঠাৎ প্রিয়ন্তির চোখে পড়লো পুকুরের পাশে একটি গাছে অনেক জাম ঝুলে আছে। ইলিশের গন্ধে জিভে পানি না আসলেও জাম দেখে পানি এসে গেলো। কিন্ত গাছের ধারে যেতে সাহস পাচ্ছিলোনা। যদি কেউ এসে পড়ে তাহলে আর রক্ষে নেই। তারপরও সাহস করে গুটিপায়ে জাম গাছের দিকে এগিয়ে যায় প্রিয়ন্তি।

পাকা কালো জামগুলো যেন ওকে ডাকছে, “এসো তুমি মোর কাছে হে প্রিয়া!” কিন্ত হাত দিয়ে সে নাগাল পাচ্ছিলোনা। লাফিয়েও কাজ হচ্ছিলো না। শেষ পর্যন্ত একটি লাঠি দিয়ে একগুচ্ছ জামে আঘাত করতেই বেশ কয়েকটি ডাউস আকারের জাম নিচে পড়লো। প্রিয়ন্তি খুশিতে আটখানা হয়ে জাম কুড়োচ্ছে। সে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই দেখলো এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে। মুখের দিকে তাঁকাতেই প্রিয়ন্তি বেশ অবাক হলো। মানুষ এতো সুন্দর কি করে হয়! প্রিয়ন্তির মনে হয় এতো সুন্দর ছেলে সে জীবনে একটিও দেখিনি। 

এতোক্ষণে প্রিয়ন্তির খেয়াল হয় ও পুরোপুরি ভিজে গেছে। শাড়িটা শরীরের সাথে সেটে আছে। সম্পূর্ণ দেহসৌষ্ঠব প্রায় উম্মুক্ত হয়ে আছে এক অচেনা যুবকের সামনে। সে শাড়ির আচল টেনে শরীর ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করে।

প্রিয়ন্তি লক্ষ্য করে ছেলেটি ওর মুখপানে অবাক দৃষ্টিতে তাঁকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। এ চাহনীর মধ্যে একটুও কদর্যতা নেই, বরং মিষ্টি হাসির মধ্যে নমনীয় মাধুর্য্যতা আছে। প্রিয়ন্তি বলতে চাইছিলো, এই ছেলে তুমি এক্ষুনি চলে যাও নাহলে তো আমি তোমার প্রেমে পড়ে যাবো!

প্রিয়ন্তি এক মুহূর্ত্ব দেরী না করে দৌড়ে রাস্তায় চলে আসে। সুপারি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখে ছেলেটি তখনো নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। সুপারি গাছে থাকা লতা বেয়ে বৃষ্টিকনা মুক্তোদানার মতো বিন্দু বিন্দু হয়ে গড়িয়ে পড়ছে প্রিয়ন্তির মুখাবয়বে। প্রিয়ন্তি বিড়বিড় করে বলে, “হে বৃষ্টি, হে বর্ষা, হে কবিগুরু আমি এ যুবককে এক দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি। তোমাদের কাছে প্রার্থনা আমি যেন এ স্বপ্নকুমারকে একান্ত আমার করে পাই। হে স্বপ্নকুমার, আমি বৃষ্টিকন্যা হয়ে তোমার হৃদয়ে থাকতে চাই চিরদিন”।

রবিবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৪

ভার্চুয়াল জীবন

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর বালিশে হেলান দিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে ব্ল্যাক কফির মগে চুমুক দিতে দিতে নেট ইউজ করাটা রক্তিমের একটা বিশেষ শখ। অফিস চলাকালীন সময়ে ইন্টারনেট ইউজ করলেও ফেসবুকে সময় দেয়া যায়না। তাই রাতের এই সময়টায় সে মূলত ফেসবুকেই সময় দেয় বেশী। ফেসবুকের হোমপেজ ব্রাউজ করতে করতে হঠাৎ রাহাতের স্ট্যাটাসে তার চোখ আটকে যায়। রাহাত এবং তার কয়েকজন বন্ধু মিলে ওই স্ট্যাটাসে জমজমাট আড্ডা দিচ্ছে। মাত্র ত্রিশ মিনিটে কমেন্টের সংখ্যা সত্তর ছাড়িয়ে গেছে! রক্তিম সবগুলো কমেন্ট মন দিয়ে পড়লো। যুথি নামের একটি মেয়ে আড্ডা বেশ জমিয়ে তুলেছে। কমেন্টগুলো দেখে রক্তিমের বেশ মজা লাগছিলো। সেও একটা কমেন্ট ছুড়ে দিলো, কি রে তোরা কি করছিস?

রাহাত রাগের ইমো দিয়ে বলে, গরুর ঘাস কাটছি! আজকাল চোখেও কম দেখছিস নাকি? রক্তিম উত্তর দেয়ার আগেই যুথি নামের মেয়েটা রক্তিমকে উদ্দেশ্য করে লিখে, রাহাত ভাই তোমার বন্ধুর চোখের লেন্স চেঞ্জ করতে হবে। তারপর শুরু হলো কমেন্টের মাধ্যমে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া। যুথির কথার তোড়ে রক্তিম প্রায়ই খেই হারিয়ে ফেলছিলো। একসময় যুথি বলে, বন্ধুরা যাচ্ছি। অনেক ঘুম পেয়েছে। কারো উত্তরের অপেক্ষা না করেই যুথি অফলাইন হলো। রক্তিম চাইছিলো যুথি আরো কিছুক্ষণ থাকুক। ওর সাথে কথা বলতে বেশ মজা লাগছিলো।

রক্তিম তারপরও বেশ খানিকক্ষণ কমেন্টগুলোয় চোখ বুলালো। যুথির কমেন্টগুলো বেশ ঝরঝরে, প্রানোচ্ছ্বল। সে অবচেতন মনে যুথির নামে ক্লিক করলো। যুথির প্রোফাইলে অনেক সুন্দর একটি প্রজাপতির ছবি দেয়া। ইনফোতে বিশেষ কিছু লেখা নেই। তবে ছবিটি দেখেই যে কারো ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠাতে ইচ্ছে করবে। রিকুয়েস্ট পাঠাবে কি পাঠাবে না, ভাবতে ভাবতে রক্তিম শেষ পর্যন্ত ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েই দিলো।

আড্ডায় আড্ডায় অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। রক্তিম ঘড়ির দিকে তাঁকাতে দেখলো রাত দেড়টা বাজে। সচরাচর সে সাড়ে বারোটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ে। তা নাহলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে বেশ দেরী হয়ে যায়। আর দেরীতে ঘুম থেকে ওঠা মানে অফিসে যেতে দেরী হওয়া।

রক্তিম ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে তাকাতে দেখলো নীলা চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। ড্রিম লাইটের আবছা আলোয় নীলাকে অনিন্দ্য সুন্দর দেখাচ্ছে। ছাব্বিশ বছর বয়সের নীলার বয়স যেন বছর পাঁচেক কমে গেছে। ঘুমের ঘোরে নীলার গোলাপী রঙের শাড়িটা হাটু পর্যন্ত উঠে গেছে। নীলচে আলোর স্নিগ্ধ প্রতিপ্রভা বিচ্ছুরিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে ওর সমস্ত মুখাবয়বে। আলো-ছায়ার খেলা, নীলার দুধে-আলতা মাখানো ফর্সা মুখমন্ডলে সৌন্দর্য্যের প্রলেপ আরেকটু এঁকে দিচ্ছে। নীলার ঠোটের পাতা খানিকটা ফাঁক হয়ে রয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে নাক দিয়ে নিঃশ্বাস না ছেড়ে ও ওষ্ঠদ্বয়ের ফাঁক দিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। নীলার এমন মায়াবী রূপ দেখে রক্তিমের বেশ ভালো লাগছিলো, ইচ্ছে করছিলো নীলার কোমল ওষ্টে আলতো করে একটা চুমু এঁকে দেয়। কিন্তু এই মাঝরাতে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলে নীলা ভীষণ রাগ করবে। রক্তিম চায়না তার সোনা বৌ কোনভাবেই তার ওপর রাগ করুক। সে নিজেকে সংযত করে পাশ ফিরে শোয়।

পরদিন বেশ দেরীতে নীলার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে রক্তিমের। তাড়াহুড়ো করে নাস্তা সেরে অফিসে রওয়ানা দেয়। যাওয়ার আগে দরজার কপাট আড়াল করে নীলার স্নিগ্ধ ঠোটে একটা চুমু এঁকে দেয়। রক্তিম চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত নীলা সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে।

অফিসের প্রবেশ পথে করিডোরে এম.ডি সাহেবের সাথে রক্তিমের দেখা। করমর্দনের জন্য রক্তিমের দিকে ডানহাত বাড়িয়ে দিয়ে তিনি সহাস্যে বললেন, কি ব্যাপার রক্তিম, আজ এতো দেরী যে?

রক্তিম লজ্জ্বাবনত মুখে বলে, না স্যার, ঘুম থেকে সময়মতো উঠতে পারিনি তাই একটু লেট হয়ে গেছে।

এম.ডি ফারুক সাহেব মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, ইটস ওকে, প্রতিদিনই তো সময়মতো আসো, একদিন দেরী হলে বিব্রতবোধ করার কোন কারণ নেই। তোমার টেবিলে গিয়ে মুবিন ব্রাদার্সের ফাইলটা আমার রুমে পাঠিয়ে দিও। বলেই করিডোরের দক্ষিণ কোণে নিজের রুমে প্রবেশ করলেন এমডি।

রক্তিম কিছুটা চাপমুক্ত হয়ে নিজের রুমে প্রবেশ করে। মুবিন ব্রাদার্সের ফাইলটা আরেকবার চেক করে বেয়ারাকে দিয়ে এম.ডির রুমে পাঠিয়ে দিলো। আর বেয়ারাকে বলে দিলো, আসার সময় যেন এক কাপ কড়া লীকার চা নিয়ে আসে। অফিসে আজ আর বিশেষ কোন কাজ নেই। জমে থাকা কাজগুলো গতকালই মোটামুটি শেষ হয়ে গেছে। রক্তিম ল্যাপটপ খুলে ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলো। ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় চোখ বুলাতেই ওর চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। অধিকাংশ শেয়ারের সূচক আজ উঠতির দিকে। তার কেনা বেশ কিছু শেয়ারের দাম অনেকদিন থেকেই পড়তির দিকে ছিলো। আজ সে শেয়ারগুলোও মাথাচাড়া দিয়ে উপরের দিকে উঠতে শুরু করেছে। দুপুরের মধ্যেই শেয়ারগুলোর দাম একটা ভালো পর্যায়ে পৌছবে আশা করা যায়।

সে খুশী মনে আরেকটা ট্যাবে ফেসবুক ওপেন করে। পেজ ওপেন হতেই দেখলো সাতটা নোটিফিকেশন। এর মধ্যে একটা নোটিফিকেশন, যুথি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এঙ্প্টে করেছে। পেজের বামদিকে নিচে তাকাতেই দেখলো তের জন বন্ধু এখন অনলাইনে রয়েছে। সে মনে মনে ভাবে, এইগুলার কি কোন কাজ নেই! সারাদিন ফেসবুকে বসে থাকে!

বামদিকের চ্যাট অপশনে ভালো করে খেয়াল করতেই যুথির প্রোফাইলের প্রজাপতির ছবি তার চোখে পড়লো, তার মানে যুথিও অনলাইনে। সে যুথির নামের উপর ক্লিক করতেই চ্যাটের ছোট পেজটা খু্েলল গেল।

সে লিখলো, হাই যুথি!!!

অনেকক্ষণ চলে যাওয়ার পরেও যুথি কোন রিপ্লাই দিলোনা। রক্তিম আবার লিখলো, কি অবস্থা, বেশী বিজি নাকি?

এবার প্রায় সাথে সাথেই রিপ্লে আসলো, না ভাইয়া, আসলে আমি গুগলে ইলেক্ট্রো ডায়নামিকসের একটা থিওরি সার্চ করছিলাম, তাই এদিকে খেয়াল করিনি।
রক্তিম রিপ্লাই দেয়,

– হুম তাই বলো, তারপর কেমন আছো তুমি?

– আমি ভালো আছি ভাইয়া। আপনি কেমন আছেন?

-হ্যাঁ আমিও ভালো আছি। আচ্ছা আমি তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করায় রাগ করোনি তো?

-না ভাইয়া রাগ করার কি আছে 

-যাক নিশ্চিন্ত হলাম। তারপর তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?

-আপনাদের দোয়ায় ভালোই চলছে।

-ভালো হলেই ভালো  তা তুমি কিসে পড়াশোনা করছো?

-আমি কম্পিউটার সায়েন্সে ২য় বর্ষে পড়ছি।

-ওয়াও গ্রেট! আমিও সায়েন্সের স্টুডেন্ট ছিলাম। গণিতে অনার্স কমপ্লিট করার পর এমবিএ করে এখন কর্পোরেট চাকরে পরিণত হয়েছি।

-ভাইয়া আপনার এডুকেশনাল এন্ড জব ব্যাকগ্রাঊন্ড দারুন!

-থ্যাংকস , তারপর তুমি কোন ভার্সিটিতে পড়ছো?

-আমি SUST এ পড়ছি।

– গ্রেট! একে তো SUST, তার ওপর জাফর ইকবাল স্যারের ডিপার্টমেন্টে পড়ছো! দারুন!

-ঠিক বলেছেন জাফর স্যারের ডিপার্টমেন্টে পড়ে আমি নিজেও গর্বিত।

-এই একজন মানুষ যার মুখ চোখের সামনে ভেসে উঠলেই নিজের আত্নবিশ্বাস অনেকখানি বেড়ে যায়। তিনি নিশ্চয় কোন যাদু জানেন নাহলে কেন উনার ছবি মনের মধ্যে ভেসে উঠলে সব ভয়-ডর দূরে চলে যাবে! একবার স্যারের দেখা পেলেই ধন্য হয়ে যাই, আর তুমি সরাসরি উনার ছাত্রী! স্যার কি নিয়মিত ক্লাস নেন?

-হ্যাঁ, উনি উনার প্রায় প্রতিটা ক্লাসেই আসেন। ঝড়-বাদলার দিনে কারেন্ট চলে গেলেও স্যার মোমবাতি দিয়ে ক্লাস-পরীক্ষা নেন।

-হুম জাফর ইকবাল স্যার সত্যিই এক অন্যরকম ব্যক্তিত্ত্ব। উনাকে দেখলেই অনুপ্রাণিত বোধ করি।
-হুম, ভাইয়া আপনি কি স্যারকে কখনো সরাসরি দেখেছেন?

-কত্তোবার দেখেছি। প্রথমবার দেখেছিলাম একুশে বইমেলায়। সাদা-কালো ধুসর চুলের এই মানুষটাকে দেখলেই আমার মাথা শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে যায়।

তারপর অনেকক্ষণ ধরে চললো তাদের চ্যাট। হঠাৎ করেই যুথি ডিসকানেক্ট হয়ে গেলো। রক্তিমও ফেসবুক থেকে লগআউট করলো

দুপুর ২টার দিকে ডিএসই’র ওয়েবসাইটে ঢুকেই রক্তিমের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। তার কেনা শেয়ারগুলোর দর স্মরণকালের মধ্যে সর্বোচ্চসীমায় উঠেছে। এখনি বিক্রি করে দিতে পারলে পুরো পঁয়তাল্লিশ হাজার টাকা প্রফিট। সে ব্রোকার হাউজ এ ফোন লাগালো, কিন্তু ফোন এনগেজ মারছে। রক্তিম বেশ বিরক্ত হলো। কয়েকবার চেষ্টার পর লাইন পেতে বলে দিলো তার লটগুলো যেন চলতি দরে বিক্রি করে দেয়া হয়।

রক্তিমের বুক থেকে যেন একটা বড় পাথর নেমে গেছে। এ শেয়ারগুলো নিয়ে অনেকদিন থেকেই সে চিন্তিত ছিলো। অনেকদিন থেকে লসে ছিলো, কিছুতেই দাম বাড়ছিলোনা। আজ যখন বাড়লো, এক লাফে এতো লাভ! সে তার ভাগ্যকে ধন্যবাদ না দিয়ে পারলোনা।

বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ফ্রেশ হয়ে সোফাতে গা এলিয়ে দিতেই নীলা চা আর চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে পাশে এসে বসলো। রক্তিম দুপুরে অফিসের কেন্টিনে খেয়ে নেয় তাই বাসায় ফিরে ভাত খায়না। স্যান্ডউইচ খেতে খেতে রক্তিম আড়চোখে নীলাকে দেখে। সাধারণ সাজে নীলাকে অসাধারণ দেখাচ্ছে। সে নীলার একটা হাত ধরে বলে, আজ তোমাকে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছে। নীলা লাজুক হাসি দিয়ে হাত সরিয়ে নিতে চায়। রক্তিম নীলাকে আরো ঘনিষ্ট করে কাছে টেনে আনে। নীলা মৃদু প্রতিবাদ জানিয়ে রক্তিমের বাহুর বাঁধন আলগা করতে চায় কিন্তু পারেনা।

রক্তিম নীলাকে বলে, আজ আমার অনেক খুশির দিন। অনেকদিনের চাপানো পাথর আজ বুক থেকে নেমে গেছে।

নীলা আদুরে সুরে বলে, কেন, এতো খুশি কেনো?

রক্তিম নীলাকে বাঁধন থেকে কিছুটা আলগা করে দিয়ে বলে, আমার আটকে থাকা শেয়ারগুলো আজ ভালো দামে বিক্রি করে দিয়েছি। মোটা অংকের প্রফিট এসেছে। আগামীকালকেই ব্যাংকে টাকা জমা পড়বে।

নীলা বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে, যাক তাহলে একটা সুরাহা হলো শেয়ারগুলোর। আমিও ভীষন চিন্তিত ছিলাম ওগুলো নিয়ে।

রক্তিম চোখমুখ উজ্জ্বল করে বলে, এই আনন্দে আমি তোমাকে কিছু উপহার দিতে চাই। কি চাও বলো?

নীলা বলে, টাকা নষ্ট করার কোন দরকার নেই। আমার শ্রেষ্ট উপহার তুমি। তুমি সবসময় পাশে থাকলে আমার আর কিছু চাইনা। বলেই নীলার দুচোখ জলে ভিজে ওঠে।

নীলার ভালোবাসার এমন বহিঃপ্রকাশে রক্তিম আশ্চর্য্য হয়। এমন লক্ষী স্ত্রী কয়জনের ভাগ্যে জুটে! রক্তিম নীলাকে আরো কাছে টেনে নেয়। ভালোবাসার আবেশে এ সন্ধ্যারাতে উভয়ে একে-অপরের সাথে মিশে যায় মধুর আলিঙ্গনে। আর মেঘমুক্ত আকাশে বৈশাখী পূর্ণিমার বাঁধভাঙ্গা আলো জানালার ফাঁক গলে আচড়ে পড়ে অন্ধকার ড্রয়িংরুমে।


৩ মাস পর…
রক্তিম ও নীলার দাম্পত্য জীবন পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও, ওদের কোল জুড়ে এখনও কোন সন্তান আসেনি। আসলে রক্তিম সবসময় চেয়েছে নীলা উচ্চশিক্ষাটা কমপ্লিট করুক। পড়ালেখা চলাকালীন সময়ে সন্তান নিলে নীলার পড়াশোনার ব্যাঘাত ঘটবে ভেবে রক্তিম সন্তান নিতে চায়নি। নীলার এম.এস.সি সম্পন্ন হওয়ার পরও রক্তিম সন্তান নিতে আগ্রহী নয়। সন্তানের কথা তুললেই কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু নীলার মাতৃহৃদয় একটি সন্তানের জন্য আকুল হয়ে আছে।

নীলা ইদানীং লক্ষ্য করেছে রক্তিমের আচরণ আগের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত। আগে কখনোই রক্তিম নীলার সাথে কড়া ভাষায় কথা বলেনি, অথচ ইদানীং সুযোগ পেলেই নীলাকে অপমান করতে ছাড়েনা। তাদের পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে এমন রক্তিমকে সে কখনোই দেখেনি। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে একজন মানুষ কতোটা পরিবর্তিত হতে পারে তার জ্বলন্ত উদাহরণ রক্তিম। গত কিছুদিন যাবত সে রাতে ঘুমায়ও বেশ দেরীতে। সে জন্য প্রায়দিনই অফিস যেতে দেরী হয়। রাত জেগে নেটে কি করে জানতে চাইলে বলে, অফিসের কাজ করছে। নীলা ঠিক বুঝতে পারেনা রাত জেগে কি এতো কাজ!

রক্তিম আর যুথির ভার্চুয়াল সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্টতা লাভ করেছে। তাদের সম্পর্ক ঘনিষ্ট থেকে ঘনিষ্টতর হয়ে প্রেম-ভালোবাসার পর্যায়ে চলে গেছে বলা যায়। রক্তিম যুথির কাছে নীলার কথা গোপন রেখেছে। যুথি জানে রক্তিম অবিবাহিত। রক্তিম বেশ কয়েকবার সিলেট গিয়ে যুথির সাথে দেখাও করেছে। যুথি দেখতে বেশ সুন্দর ও স্মার্ট, নীলার চেয়ে সামান্য একটু ফর্সা। কিন্তু তারপরও নীলার ব্যক্তিত্ত্ব আর সৌন্দর্য্যের কাছে যুথির সৌন্দর্য্য যেন ম্লান হয়ে যায়।

ঘরে সুন্দরী, শিক্ষিত স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও রক্তিম যুথির চটপটে কথাবার্তার মধুময়তা ও চঞ্চলতায় নিজেকে সঁপে দেয়। প্রিয়তমা স্ত্রীর ভালোবাসাও তুচ্ছ মনে হয় যুথির প্রাণচাঞ্চল্যে। দিনে অন্তত একটিবার যুথির সাথে কথা না বললে মনে হয় যেন যুগ-যুগান্তর পেরিয়ে যাচ্ছে জাগ্রত চৌরঙ্গীর নির্বাক ভাস্কর্য্যের মতো নিশ্চল দাঁড়িয়ে। সময় পেলেই ফেসবুক আর সেলফোনের বিচ্ছুরিত তরঙ্গকণায় হারিয়ে যায় কথার ভুবনে। মাঝে মাঝে তার মনে হয় সে কি দুজনকেই ঠকাচ্ছেনা! কিন্তু তা নিমিষেই মিলিয়ে যায় হৃদয়ের কোলাহলে। এ সবকিছুই চলে নীলার দৃষ্টির অগোচরে।

অফিসের গাড়ি বাইরে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কিছুক্ষণ ধরে। ড্রাইভার হর্ণ দিচ্ছে একটু পরপর। রক্তিম তাড়াহুড়ো করে গাড়িতে গিয়ে উঠে। আগে অফিসে যাওয়ার আগে রক্তিম নীলার কোমল অধরে আলতো করে চুমুর পরশ বুলিয়ে দিতো। অথচ এ ক’দিনে সবকিছু বদলে গেছে। নীলার ভীষণ কান্না আসে। রক্তিম দৃষ্টি সীমা ছাড়িয়ে পর্যন্ত নীলা সজল চোখে দরজা আকড়ে থাকে।

ড্রয়িংরুম দিয়ে যাওয়ার সময় নীলার চোখে পড়ে টি-টেবিলের মধ্যে ল্যাপটপ পড়ে রয়েছে। রক্তিম তাড়াহুড়োয় নিতে ভুলে গেছে। নীলা অনেক খুশী হলো ল্যাপটপ দেখে। আজ তাহলে প্রাণখুলে কানাডায় বড় আপুর সাথে কথা বলা যাবে। নীলা ডান হাতে চোখ মুছতে মুছতে ল্যাপটপের পাওয়ার বাটনে অন করে। কিন্তু চারপাশ কোথাও মডেমের অস্তিত্ত্ব খুঁজে পেলনা। তো কি আর করা, বিফল মনোরথ হয়ে হার্ডডিস্কের এক ড্রাইভ থেকে আরেক ড্রাইভে ঘুরতে লাগলো। ডি ড্রাইভে বেশ কিছু ছবি রয়েছে। সে মাউসে ক্লিক করে ডি ড্রাইভ ওপেন করতেই সাতটি ফোল্ডার দেখা গেলো। সব ফোল্ডারেই রাখা বিভিন্ন সময়ে তোলা ছবি। প্রথম ফোল্ডারে রাখা থাইল্যান্ড ট্যুরের বেশ কিছু ছবি। সে ছবিগুলো দেখতে দেখতে জঔ১৪৩ নামে একটি ফোল্ডার দেখতে পেলো।

সে ফোল্ডারে থাম্বনেইলস দিতেই নীলার শিরদাড়া বেয়েএকটি শীতল তরঙ্গ বিদ্যুৎবেগে নেমে গেলো। প্রায় প্রত্যেকটি ছবিতেই রক্তিম আরেকটি মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে আছে। উভয়েই একে অপরের সাথে বেশ ঘনিষ্ট ভঙ্গিতে বসে আছে। নীলা তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছেনা। বুকের ভিতর থেকে দলা পাকিয়ে কান্না বেরিয়ে আসতে গিয়েও পারছেনা, গলা পর্যন্ত এসে আটকে যাচ্ছে।

হঠাৎ সে ভীষন একাকীত্ব অনুভব করছে। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সব অন্ধকার একত্রে জমা হয়েছে ওর হৃদয়ের অন্দরমহলে। সে যতোটা সম্ভব নিজেকে সামলে নিয়ে ছবিগুলো দেখলো। অল্পবয়েসী একটি মেয়ে যার দুচোখ কাজলে আঁকা, মাঝারী গড়ন, ফর্সা বর্ণ, কালো চুলের মধ্যে হালকা লালচে শেড, ভরাট যৌবন। প্রত্যেকটি ছবিই সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলো।

গলায় আটকে থাকা কান্না হঠাৎ করে বমির আদলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নীলা দ্রুত বেসিনের কছে যায়। গড়গড় কওে অনেকখানি তরল পদার্থ উদগীরণ করে। একটু ধাতস্থ হয়ে দুহাত ভরে চোখ মুখে পানি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই নীলার বুকের আঁচল খসে পড়ে পায়ের পাতা অবধি। বেসিনের আয়নায় নিজের উদ্ধত যৌবনের দৃশ্যমান চোখ রাঙ্গানিতে নীলা ভীষণ লজ্জ্বিতবোধ করে। দুহাতে উর্ধ্বভাগ ঢাকতে গিয়েও ঢাকেনা। তার অবয়ব গঠনে স্রষ্টা কোন কৃপণতা করেননি। নারী সৌন্দর্য্যের ষোলকলায় সে পরিপূর্ণ। তারপরও তার স্বামী কেন অন্য নারীতে আকৃষ্ট! কি আছে সেই মেয়েটির মধ্যে! নীলা রাগ মাখা ঈর্ষায় আবিষ্ট হয়।

সন্ধ্যায় বেশ দেরীতে বাসায় ফিরলো রক্তিম। নীলার মধ্যে কোন ভাবাবেগ নেই। এক্ষুনি রক্তিমকে কিছু বুঝতে দেয়া যাবেনা। রক্তিম ফ্রেশ হতে বাথরুমে ঢুকতে, নীলা চুপিচুপি রক্তিমের মোবাইল ফোনের লাস্ট ডায়াল কল থেকে আন্দাজে যুথির নাম্বার নিয়ে নিজের মোবাইলে সেভ করলো।

সন্ধ্যার নাস্তা সেরে রক্তিম বাইরে বেরুলো। রক্তিম বেরুতেই নীলা দরজা বন্ধ করে দিলো। ওর বুক টিপটিপ করছে। নিজেকে অস্তিত্ত্বহীন জড় পদার্থের মত মনে হচ্ছে। যেন কোন অনুভুতি নেই ওর দেহপিন্ডে। ওপাশে কে ফোন ধরবে? তার সাথে রক্তিমের কি সম্পর্ক ভাবতেই নীলার পুরো শরীর ভুমিকম্পের মত প্রবল বেগে কাঁপতে শুরু করে। সে কাঁপা হাতে যুথির নাম্বারে ডায়াল করলো।

অনেকক্ষণ রিং হওয়ার পরও অপরপ্রান্তে কেউ কল রিসিভ করলোনা। দ্বিতীয়বার বেশ কিছুটা সময় রিং হওয়ার পর অপরপ্রান্ত হতে ভেসে এলো, হ্যালো, স্লামালিকুম।

নীলা কাঁপা গলায় বললো, হ্যালো।

যুথি বলে, জ্বী, কে বলছেন?

নীলা তার কন্ঠে যতোটাসম্ভব দৃঢ়তা এনে বলে, আমি নীলা। ঢাকা থেকে বলছি। আপনার সাথে আমার কিছু কথা ছিলো।

আমার সাথে কথা! আপনি কে? যুথি জিজ্ঞেস করে।

আমি কে আগেই বলেছি। এখন আমি আপনাকে যা যা জিজ্ঞেস করবো তার সঠিক জবাব দিয়ে আমাকে সাহায্য করবেন প্লীজ। কথাগুলো বলে নীলা থামে।

-আমার সাথে আপনার এমন কি কথা আমি বুঝতে পারছিনা! তারপরও আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করবো। কি বলবেন বলুন।

-আপনি নিশ্চয় রক্তিমকে চিনেন?

-চিনব না কেন! অবশ্যই চিনি। কি হয়েছে রক্তিমের! ওর কথা জিজ্ঞেস করছেন কেন?

-না ওর কিছু হয়নি। আচ্ছা আপনি কতোদিন থেকে ওকে চিনেন?

-অনেকদিন থেকেই চিনি তবে ঠিক কতোদিন বলতে পারবোনা।

-হুম, তা আপনি ওর সম্পর্কে কতোটুকু জানেন?

-একজন মানুষকে যতোটা জানা গেলে ভালোবাসা যায় তার চেয়ে অনেক বেশী জানি।

-আপনি জানেন কি আপনি একটা বড় ভুল করতে চলেছেন?

-ভুল! ভুল কোথায় করছি! আমি তো ভুলের কিছু দেখছিনা। আমি ওকে ভালোবাসি, সেও আমাকে ভালোবাসে।

একটা ছোট দম নিয়ে আসল বোমা ফাটালো নীলা। নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, রক্তিম যে বিবাহিত সে কথা কি জানেন?

অপরপ্রান্ত থেকে সাথে সাথে হুংকার দিয়ে যুথি বললো, অসম্ভব! এটা কখনোই হতে পারেনা। আপনি বানিয়ে বলছেন। আপনি নিশ্চয় আমাদের সম্পর্কে ভাঙ্গন ধরানোর জন্য এসব বলছেন।

নীলা বলে, আমি এক বিন্দুও বানিয়ে বলছিনা। রক্তিম বিবাহিত এবং আমি তার বিবাহিতা স্ত্রী। আমরা আজ থেকে পাঁচ বছর আগে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছি।

যুথির গলা মিইয়ে আসে। সে ভাঙ্গাগলায় বলে, আপনি সত্য বলছেন তার প্রমাণ কি?

নীলা দৃঢ়কন্ঠে বলে, আমিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ, সবচেয়ে বড় সত্য। পৃথিবীতে এর চেয়ে ধ্রুব সত্য আর কিছু হতে পারেনা।

যুথি বলে, আপনার মুখের কথাতেই প্রমাণ হয়না আপনি রক্তিমের বিবাহিতা স্ত্রী। আপনি কি প্রমাণ দিতে পারবেন? আপনি যতোক্ষণ না উপযুক্ত কোন প্রমাণ দিতে পারছেন ততোক্ষণ আমিও বিশ্বাস করতে পারছিনা।

নীলা শান্তস্বরে উত্তর দেয়, আমার কাছে যথেষ্ট পরিমাণ প্রমাণ আছে। আমি উপযুক্ত প্রমাণ নিয়েই আপনার সাথে কথা বলছি। আপনি চাইলে আমাদের কাবিননামার কপি আপনাকে পাঠাতে পারি।

এবার যুথির খানিক বিশ্বাস হয়। একজন মেয়ে আরেকজন মেয়ের সাথে এতোটা মিথ্যে কখনো বলবেনা। যুথির ভীষণ কান্না পায়। প্রেম-ভালোবাসা নামক জিনিসটার ওপর ভীষন রাগ হয়। নীলা রিসিভারে কান রেখেই বুঝতে পারছিলো, ওপাশে যুথি কাঁদছে। যুথি কান্নাতাড়িত কন্ঠে বলে, আপনার কথাগুলো যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আমার কিছু বলার নেই। কিন্তু ভাবতে কষ্ট হচ্ছে রক্তিম কীভাবে আমার সাথে এ ছলনা করলো! জীবনে এই প্রথম আমি কাউকে ভালোবেসেছিলাম আর সে ভালোবাসাতেই এমন প্রতারিত হলাম। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, আপনি কোন চিন্তা করবেন না আমি চাইনা আমার কারনে কারও জীবন তছনছ হয়ে যাক। সে আমার কাছে আর কোন প্রশ্রয় পাবেনা। সে এটাও জানবেনা আপনি আমায় ফোন করেছেন।

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে যুথি মোবাইল রাখতে গিয়েও রাখেনা। নীলা বুঝতে পারে অপরপ্রান্তে যুথি অঝোরে কেঁদে চলেছে। ঢুকরে ঢুকরে কান্নার শব্দে তারহীন ফোনের সমস্ত তরঙ্গ বিষাদময় হয়ে উঠে। অনেকক্ষণ পর নীলা ফোন কেটে দেয়। মেয়েটা প্রাণভরে কাঁদুক। কেঁদে কেঁদে হালকা করুক নিজের মনটাকে। নীলা নিজেও মেয়ে তাই সে বুঝতে পারে, একটা মেয়ে কতোটা আবেগ, কতোটা মন দিয়ে একজন মানুষকে ভালোবাসে। তার চোখের কোনও অশ্রুজলে ভিজে ওঠে।

সকালের তেজোদীপ্ত সূর্য্যকীরণ উজ্জ্বল জ্যেতি ছড়িয়ে দিয়েছে পুরো শোবার ঘরে। আড়মোড়া ভেঙ্গে পাশ ফিরতেই রক্তিমের চোখে পড়ে, সদ্য গোসল সেরে ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় নীলা হালকা প্রসাধনী করছে। সাদা তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল বেঁধে রাখা। কানের লতি বেয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু জলকণা। তারুন্যের উজ্জ্বল আভায় রাঙ্গানো মুখমন্ডল যেন নন্দনকাননে প্রস্ফুটিত পুষ্পের একটি কোমল পাঁপড়ি। এমন সুন্দরী স্ত্রী ঘরে থাকা সত্ত্বেও সে কেন অন্য মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে ভাবতেই নিজে লজ্জ্বিতবোধ করছে, অপরাধবোধে আচ্ছ্বন্ন হচ্ছে। সে মনে মনে যুথিকে ধন্যবাদ জানায়। যুথি যদি গতরাতের অপ্রিয় সত্য বজ্রকঠিন কথাগুলো না বলতো তবে হয়তো তার জীবনে একটা ঝড় বয়ে যেত। সে মনে মনে যুথির কাছে ক্ষমা চেয়ে নেয়। ছাদের কার্নিশের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বিড়বিড় করে বলে, যুথি তুমি অনেক ভালো থেকো আর এই পিশাচকে ক্ষমা করে দিও নিজগুণে। যদিও জানি এই অপরাধের কোন ক্ষমা হয়না তবুও তোমার কাছে এতোটুকু করুণা ভিক্ষা করছি।

রক্তিমের বিড়বিড় শব্দে নীলা পেছন ফিরে চাইলো। চোখের ঈশারায় জিজ্ঞেস করলো, কি ব্যাপার? রক্তিম কোন কথা না বলে নীলার ডানহাতে আচমকা টান দিয়ে বিছানায় নিজের বুকে নিয়ে এলো। নীলা মৃদু রাগ দেখিয়ে উঠে যেতে চাইলো। ঘন নিঃশ্বাস নিতে নিতে নীলা বললো, এই সাত-সকালে এসব কি হচ্ছে! শেষ পর্যন্ত রক্তিমের দৃঢ় বাঁধুনীতে পিষ্ট হয়ে নিজেকে সঁপে দিতে বাধ্য হলো। নীলার কোমল ওষ্ঠে রক্তিম নিজের ওষ্ঠ ডুবিয়ে দিলো বেশ জোর করে। ভালোবাসার মধুর অবগাহনে দুটি ভিন্ন সত্ত্বা অভিন্ন সত্ত্বায় পরিণত হয়ে সাঁতরে বেড়াতে লাগলো ভালোবাসার গহীন সমুদ্রে। যে ভালোবাসা কখনোই হারিয়ে যাবার নয়।
Copyright © 2014 রিপন ঘোষের খেরোখাতা All Right Reserved
^
Blogger দ্বারা পরিচালিত.