আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে

Latest News:
ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ফিচার লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সিলেটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

১৯১৯ সালের ১১ অক্টোবর, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবকাশ যাপনের জন্য আসামের তৎকালীন রাজধানী শৈলশহর শিলং এলেন। তার সফরসঙ্গী হিসেবে আছেন পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পুত্রবধূ প্রতিমাদেবী। শিলং এর পার্শ্ববর্তী শহর সিলেটে এই খবর চাউর হয়ে গেলো দ্রুততম সময়ে। সিলেটের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে একটা চাপা উত্তেজনা বইতে শুরু করলো। কবিগুরু এতো কাছে এসেছেন। কোনভাবেই এ সুযোগ হাতছাড়া করা যায়না। যেভাবে হোক রবি ঠাকুরকে সিলেটে আনতেই হবে।

সিলেট ব্রাক্ষসমাজের তৎকালীন সম্পাদক গোবিন্দ নারায়ন সিংহ কবিকে সিলেট পদার্পণের নিমন্ত্রণ জানিয়ে টেলিগ্রাম করলেন। কিন্তু বাধ সাধলো তৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা। ভৌগলিক দিক দিয়ে সিলেট শিলং এর কাছাকাছি হলেও সিলেট পর্যন্ত সরাসরি রাস্তা ছিলোনা। শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি পর্যন্ত সড়ক ছিল। চেরাপুঞ্জি থেকে খাসিয়ারা ব্যক্তিকে বহন করে নিয়ে যাওয়ার একটি পদ্ধতি প্রচলন ছিলো। কিন্তু এ ব্যবস্থা মানবাধিকারের লংঘন বলে কবি সরাসরি নাকচ করেন এবং সিলেট থেকে প্রেরিত নিমন্ত্রণ বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করেন।

কবির নেতিবাচক উত্তর পেয়ে গোবিন্দ নারায়ন সিংহ আনজুমানে ইসলাম, মহিলা পরিষদসহ বিভিন্ন সংঘটনের সাথে যোগাযোগ করে কয়েকটি টেলিগ্রাম পাঠান। আবেগঘন টেলিগ্রামগুলো কবির হৃদয়কে প্রভাবিত করে। তিনি সিলেট আসার দীর্ঘ অথচ বিকল্প পথ গৌহাটী থেকে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের লামডিং-বদরপুর সেকশন হয়ে করিমগঞ্জ-কুলাউড়া হয়ে সিলেট পৌছানোর পথে সিলেট আসতে রাজী হন।

৩১ অক্টোবর কবিগুরু শিলং থেকে গৌহাটী অভিমূখে যাত্রা করেন। সেখানে কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিশাল আয়োজন করা হয়। দিন তিনেক সেখানে অবস্থান করে কবি ৩ নভেম্বর গৌহাটী থেকে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। গৌহাটী থেকে সিলেটের পথ প্রায় প্রতিটি স্টেশনেই কবিকে এক পলক দেখার জন্য ভক্তদের ভিড় লেগে যায়। সিলেট থেকে একটি প্রতিনিধিদল কবিগুরুকে এগিয়ে আনতে বদরপুর পর্যন্ত যায়। ট্রেন কুলাঊড়া জংশনে পৌছালে তাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানো হয়। কবি ও তার সহযাত্রীরা কুলাঊড়াতে রাত্রিযাপন করেন।

কবিকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য অভ্যর্থন পরিষদ গঠন করা হয়। সভাপতি নিযুক্ত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ। ৫ নভেম্বর সকালে ট্রেন সিলেট স্টেশনে পৌছালে কবিগুরুকে রাজকীয় সম্মান প্রদর্শন করা হয়। অভ্যর্থনা জানাতে উপস্থিত হন খানবাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদ, মৌলভী আব্দুল করিম, রায়বাহাদুর প্রমোদচন্দ্র দত্ত, এহিয়া ভিলা, কাজী বাড়ি ও মজুমদার বাড়ী, দস্তিদার বাড়ির অভিজাত ব্যক্তিবর্গ। সিলেট মহিলা সমাজের পক্ষে অভ্যর্থনা জানান নলিনীবালা চৌধুরী।

সুরমা নদীর উপর ঐতিহ্যবাহী কীনব্রীজ তখনো হয়নি। কবিগুরু ও তার সহসঙ্গীরা বজরায় সুরমা নদী পাড়ি দিয়ে মূল সিলেট শহরে প্রবেশ করেন। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী চাঁদনীঘাটকে পত্র-পুষ্প পতাকা, মঙ্গল ঘট আর লাল শালু দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়। শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তি মৌলভী আব্দুল করিমকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ একটি সুসজ্জিত ফিটন গাড়িতে করে শহরের উত্তর-পূর্বাংশে ছোট টিলার উপর পাদ্রী টমাস সাহেবের বাংলোর পাশে একটি বাড়িতে যান। এখানেই কবির থাকবার ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। সেখানে পৌছালে কবিকে সঙ্গীত ও চন্দন তিলকের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় স্থানীয় ব্রাহ্মসমাজের আমন্ত্রণে কবি তাদের উপাসনায় যোগ দেন। পরদিন ৬ নভেম্বর সকালে লোকনাথ টাউনহলে কবিকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। এতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন সৈয়দ আব্দুল মজিদ। অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন নগেন্দ্রচন্দ্র দত্ত। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অভিনন্দনের জবাবে বক্তৃতা প্রদান করেন যা পরে ১৩২৬ বঙ্গাব্দে প্রবাসী পত্রিকার পৌষ সংখ্যায় ‘বাঙালির সাধনা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। একইদিন দুপুরে মুরারীচাঁদ কলেজের (এম.সি কলেজ) বাংলা ও সংস্কৃতের অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রীর  আমন্ত্রণে কবি তার বাড়িতে যান। বেলা দুইটায় ব্রাহ্মসমাজগৃহে সিলেট মহিলা সমিতি আয়োজিত সংবর্ধনায় যোগ দেন।

এরপর কবি শহরের উপকন্ঠে মাছিমপুর এলাকায় মনিপুরী পল্লীতে যান। কবির সম্মানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিষ্ণুপ্রিয়া মনিপুরী রমনী কর্তৃক পরিবেশিত রাসনৃত্য মুগ্ধ হন। এখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কবিগুরু পরবর্তীতে শান্তি নিকেতনে মনিপুরী নৃত্য চালু করেছিলেন। সেই উদ্দেশ্যে ১৯২০ সালে কবিগুরু তৎকালীন সিলেট জেলার কমলগঞ্জ থানার বালিগাও গ্রামের মণিপুরী নৃত্যগুরু নীলেশ্বর মুখার্জী, ত্রিপুরা থেকে গুরু বুদ্ধিমন্ত সিংহ ও আসামের গুরু সেনারিক সিংহ রাজকুমারকে শান্তিনিকেতনে নিয়ে যান প্রশিক্ষক হিসেবে।

পরদিন সাত নভেম্বর সকালে সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্র চৌহাট্টার বিখ্যাত সিংহ পরিবারের এক নবজাতকের নামকরণ অনুষ্ঠানে কবি যোগদান করেন। এদিন দুপুরে মুরারিচাঁদ ছাত্রাবাসে কলেজের ছাত্র-শিক্ষকমন্ডলী কবিগুরুকে সংবর্ধনা প্রদান করেন। কলেজের ছাত্ররা একটি শোভাযাত্রা করে গীতবাদ্য সহকারে সভামন্ডপে নিয়ে আসেন। অধ্যাপক নলিনীমোহন শাস্ত্রী সরচিত কবিতা পাঠ করেন। কবিকে একাধিক মানপত্র প্রদান করা হয়। অভিনন্দনের উত্তরে কবি সুদীর্ঘ বক্তব্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে এই বক্তব্য শান্তিনিকেতন পত্রিকার ১৩২৬ সালের পৌষ সংখ্যায় ‘আকাঙ্ক্ষা’ নামে প্রকাশিত হয়। এমসি কলেজের সেই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে হাজার হাজার ছাত্রের মধ্যে পরবর্তীকালের একজন বিখ্যাত বহুভাষী রমসাহিত্যিক তন্ময় হয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বক্তব্য শুনছিলেন। এর কিছুদিন পর তিনি শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার গুণমুগ্ধ সেই ভক্তকে শান্তিনিকেতনে আসার কথা বলেন। ১৯২১ সালে সেই ছাত্র শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন এবং রবীন্দ্রনাথের বিশেষ অনুগ্রহ লাভ করেন। তিনি হচ্ছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলী।

সভাশেষে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ অপূর্বচন্দ্র দত্তের আতিথ্যগ্রহণ করে তার বাসায় পদার্পন করেন। পরে শহরের গণমান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে রায়বাহাদুর নগেন্দ্রনাথ চৌধুরীর বাসায় এক প্রীতিসম্মেলনে যোগ দেন। পরদিন আট নভেম্বর  কবিগুরু সিলেট থেকে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলার উদ্দেশ্যে সিলেট ত্যাগ করেন। আর বিমুগ্ধ নয়নে পেছনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে থাকেন তার গুণমুগ্ধরা।

শনিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৫

চন্দ্রবিজয়ী তিন নভোচারীর ঢাকা ভ্রমণ

ষাট দশকের শেষার্ধ, তখন সময়টা এমন ছিল যে পূর্ব পাকিস্তানীদের জীবনে খুব কম সময়ই উৎসবের উপলক্ষ্য আসতোসব সময় এক আতংকে সময় কাটতো সবার, এই বুঝি পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের অধিকার, আমাদের দাবী ছিনিয়ে নিয়ে চিরতরে নিস্তব্ধ করে দিবে আমাদের মুখতারপরও এ সময় কিছু ব্যাপার এদেশবাসীর উৎসবের উপলক্ষ্য নিয়ে এসেছিল তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চন্দ্র বিজয়ী তিন নভোচারীর স্বস্ত্রীক ঢাকা ভ্রমণ

নভোচারীত্রয় বিশ্বভ্রমনের ১৭ টি দেশের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তানে আগমন করেন
১৯৬৯ সালের ২৭শে অক্টোবর, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকা নগরী এক উৎসবমুখর বেশ ধারন করেসারা পূর্ব পাকিস্তান থেকে হাজার হাজার নারী পুরুষের ঢল নামে ঢাকায়তৎকালীন কুর্মিটোলা বিমান বন্দর ও ঢাকায় প্রবেশের মুল রাস্তায় প্রায় ১০ লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটেরাস্তার দু-পাশে নারী-পুরুষ, ছেলে, বুড়ো সমানে ভিড় করতে থাকে

দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের সময় মার্কিন বিশেষ বিমানটি এ্যাপোলো-১১ মিশনের নভোচারী ও চন্দ্রবিজয়ী বীর নেইল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স এবং তাঁদের স্ত্রীদের নিয়ে যখন বিমান বন্দরে অবতরণ করেন,তখন প্রতিরক্ষা বাহিনীর আবেষ্টনী ভেদ করে জনতা বিমানের দিকে দৌড়াতে শুরু করেতিন চন্দ্র বিজয়ী ও তাঁদের স্ত্রীরা বিমান থেকে বেরিয়ে আসলে জনতা তুমুল ও মুহুর্মুহু করতালির মাধ্যমে তাঁদের অভিনন্দন জানায়নভোচারীরাও হাত তুলে এ অভিবাদনের জবাব দেনবিমান বন্দরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা রঙীন পোষাক পরিধান করে তাঁদের ফুলের তোড়া দ্বারা বরণ করে নেয়বিমান বন্দরে শহরের গণ্যমান্য ব্যক্তি, উচ্চ পদস্থ সরকারী কর্মকর্তাবৃন্দ এবং বহু সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেনপূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে অবস্থানরত বহু মার্কিন নাগরিকও বিমান বন্দরে এসে উপস্থিত হন

বিমান বন্দরটিকে নভোচারীদের ছবি ও প্রতিকৃ্তি এবং পাকিস্তান ও মার্কিন পতাকায় সুসজ্জিত করা হয়একটি বিরাট ব্যানারে লেখা ছিল, “আপনাদের এ সাফল্যে সমগ্র মানবজাতি গৌরবান্বিতবিমান বন্দর হতে একখানা খোলা সেভ্রোলেট গাড়ীতে নভোচারীত্রয় এবং অপর একখানা গাড়ীতে মিসেস কলিন্স ও মিসেস অলড্রিনকে নিয়ে শোভাযাত্রা সহকারে শহরের প্রায় নমাইল রাস্তা পরিভ্রমণ করা হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে ছেলেরা ঢোল বাজিয়ে তাঁদের অভিনন্দন জানায়কেউ ফুলের তোড়া, কেউ ফুলের পাপড়ি, কেউবা অভিনন্দন লিখিত শব্দমালা চলন্ত গাড়ীর প্রতি নিক্ষেপ করে তাঁদের অভিনন্দন জানায়

দীর্ঘ শোভাযাত্রা শেষে অতিথীরা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান শেরাটন) পৌছেনসেখানে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাঁরা ভাষণ দেনগভীর আনন্দের সহিত তাঁরা সাংবাদিকের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেনমহাশূন্যচারীদের আগমন উপলক্ষে তাঁদের চাঁদে অবতরণ এবং পরবর্তী বিভিন্ন কার্যক্রমের উপর একটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়এ সময় নভোচারীদের স্ত্রীরাও স্থানীয় বিশিষ্ট মহিলা ও মহিলা সাংবাদিকদের সাথে এক বৈঠকে মিলিত হন

ঢাকা টেলিভিশন (বর্তমান বাংলাদেশ টেলিভিশন) সাধারনত সোমাবার বন্ধ থাকলেও এদিন মহাশূন্যচারীদের আগমনের দৃশ্য সরাসরি প্রচারের জন্য বিশেষ অধিবেশনের ব্যবস্থা করেবিকেলে পূর্ব পাকিস্তান সরকার নভোচারীদের এক সম্বর্ধনা ও প্রীতিভোজের আয়োজন করেগভর্ণমেন্ট হাউসে ৬জন বিউগল বাদকের নিনাদের মধ্য দিয়ে মহাশূন্যচারীদের আগমনীবার্তা ঘোষনা করা হয়অনুষ্টানে উপ-মহাদেশের ঐতিহ্যবাহী জাঁকজমক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়পূর্ব পাকিস্তানের বিশিষ্ট রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীবৃন্দ ছাড়াও শ্রমিক ও ছাত্রনেতৃবৃন্দও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন

উক্ত অনুষ্ঠানে মহাশূণ্যচারীগণ তৎকালীন গভর্নর জনাব আহসানের সাথে উপহার ও শুভেচ্ছা বিনিময় করেনজনাব আহসান এ অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানেরও প্রতিনিধিত্ব করেনঅনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের সাথে অন্যতম আকর্ষন ছিল এ্যাপোলো-১১ রকেটের মডেল সন্নিবেশিত বিরাটকার একটি কেকচন্দ্রবিজয়ী নভোচারী ও তাঁদের স্ত্রীদের সম্বর্ধনা অনুষ্ঠানে গভর্ণর আহসান বলেন, “এ বিরাট সাফল্য বিজ্ঞান ও কারিগরী বিজ্ঞানের বিজয় এবং একটি মহান সমাজের সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বিপুল আকারে মানবিক ও বৈষয়িক সম্পদের সমুন্নয় সাধনেরই ফলশ্রুতিগভর্ণর পূর্ব পাকিস্তান ভূগোল সমিতির পক্ষ হতে মহাশূণ্যচারীদের একটি স্বর্ণপদক প্রদান করেনপৃথিবীর বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রদানদের বাণী সম্বলিত যে ফলকটি মহাশূণ্যচারীগণ চন্দ্রতরীতে করে চাঁদে নিয়ে গিয়েছিলেন, তার একটি রেপ্লিকা তারা গভর্ণরের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টকে উপহার দেনপাকিস্তানের জনগণের জন্য ফেলে আসা ফলকের একটি প্রতিকৃতিও তারা আহসানের নিকট প্রদান করেন

মাত্র একুশ ঘন্টা ঢাকায় অবস্থানের পর চন্দ্রমানবরা পরদিন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটায় তাঁদের বিশেষ বিমানযোগে ব্যাংককের পথে ঢাকা ত্যাগ করেনবিমান বন্দরে বহু লোকজন ও সরকারী কর্মকর্তাবৃন্দ তাঁদের বিদায় অভিবাদন জানান সময় অনেকের চোখের কোণে জলের চিলিক দেখা যায়স্বল্পসময়েই তারা এদেশের জনগণের হৃদয়ের মণি কোঠায় স্থান করে নেন

তথ্যসূত্র; এই পোষ্টটি তৈরী করতে ১৯৭০ সালে প্রকাশিত গাজীউর রহমান লিখিত রকেট ও চন্দ্র বিজয়ের ইতিকথানামক তথ্যবহুল বইয়ের যথেষ্ট সাহায্য নেয়া হয়েছেউইকিপিডিয়ারও কিছু সাহায্য নেয়া হয়েছেআর গুগলে অনেক খুঁজাখুঁজি করেও নভোচারীদের ঢাকা ভ্রমনের ভালো কোন ছবি পাইনি!

রবিবার, ৭ ডিসেম্বর, ২০১৪

ছিটমহল - ইতিহাসের এক অযাচিত বিষফোঁড়া

 
'নিজভূমে পরবাসীএই কথাটির সাথে আমরা কমবেশী পরিচিতআর এই কথাগুলোর বাস্তব প্রমাণ বাংলাদেশ-ভারতের মোট ১৬২টি ছিটমহলের মানুষতাদের নিজস্ব ভূমি আছেনামমাত্রে তারা একটি দেশের অংশ, কিন্তু তাদের নূন্যতম মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যাপারে সরকারের কোন মাথাব্যাথা নেই

বাংলাদেশ ও ভারত সরকার কয়েকবার পদক্ষেপ নিয়েও উল্লেখযোগ্য কোন অগ্রগতি হয়নিসর্বশেষ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের আপত্তিতে স্থল সীমান্ত চুক্তি অর্থাৎ ছিটমহল বিনিময় প্রক্রিয়া আটকে ছিলসম্প্রতি পশ্চিম বঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়  তার অবস্থান পালটেছেনঅনেকদিন থেকে ঝুলে থাকা ছিটমহল বিনিময় ইস্যুতে তার সমর্থন জানানোর ঘোষনাকে সাধুবাদ জানাই

আমাদের অনেকের কাছেই ছিটমহল ব্যাপারটা ঠিক পরিষ্কার নয়একটি দেশের ভূমি আরেক দেশের ভেতরে গেল কীভাবে! কিছুদিন আগেও এ ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক বোধগম্য ছিলনা! ছিটমহল কী! তাই নিয়ে লিখতে বসেছি আজ

সহজভাবে বলতে গেলে ছিটমহল হচ্ছে কোন দেশের মূল ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং অন্য একটি দেশের মূল ভৌগলিক সীমানার অভ্যন্তরে বিরাজমান ভূখণ্ড বা জনপদছিটমহল দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এবং ওখানে যেতে হলে অন্য দেশটির জমির উপর দিয়ে যেতে হয়

বাংলাদেশ-ভারত মিলিয়ে মোট ১৬২টি ছিটমহল রয়েছেএর মধ্যে ভারতের ভেতর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল আর বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ১১১টি ছিটমহল রয়েছেবাংলাদেশ ও ভারতের মোট ছিটমহলের আয়তন ২৪ হাজার ২৬৮ একরবাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ৭ হাজার ১১০ একরঅন্যদিকে ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মোট ক্ষেত্র ১৭ হাজার ১৫৮ একর

বাংলাদেশের ছিটমহলগুলো প্রশাসনিক দিক থেকে লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানার অন্তর্গতএদের মধ্যে লালমনিরহাটের আওতায় ৩৩টি ও কুড়িগ্রামের আওতায় রয়েছে ১৮টি ছিটমহলভৌগলিক দিক থেকে এদের ৪৭টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশের কুচবিহার জেলার অভ্যন্তরে এবং ৪টি জলপাইগুড়ি জেলার অভ্যন্তরে অবস্থিত

বাংলাদেশের ভেতর ভারতের ছিটমহলগুলোর মধ্যে পঞ্চগড় জেলার সদর, বোদা ও দেবীগঞ্জ থানায় মোট ৩৬টি, নীলফামারী জেলার ডিমলা থানায় ৪টি, লালমনিরহাট জেলার হাতিবান্ধা ও পাটগ্রাম থানায় মোট ৫৯টি এবং কুড়িগ্রাম জেলার ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারী থানায় মোট ১২টি ছিটমহল অবস্থিতপ্রশাসনিক দিক থেকে এগুলি সবই ভারতের কুচবিহার জেলার অন্তর্গত

ছিটমহলের ইতিহাসঃ
ছিটমহল সৃষ্টির পেছনে মূলত দায়ী রেডক্লীফের বিতর্কিত মানচিত্র তবে এই মানচিত্র নিয়ে আলোচনার আগে আরো কিছু বিষয় জানতে হবে

ছিটমহলের ইতিহাসের শুরু রংপুর অঞ্চলে মোগল শাসন প্রতিষ্ঠার পরআকবরের সেনাপতি রাজা মানসিংহ ষোল শতকে (১৫৭৫ সালে) রংপুর অঞ্চলের কিছু অংশ জয় করেসতের শতকে (১৬৮৬ সালে) এই পুরো অঞ্চলটি মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ঘোড়াঘাট সরকারের অধীনে ন্যস্ত হয়অর্থাৎ তখন রংপুর অঞ্চল মোগলদের অধীন এবং তার উত্তরে স্বাধীন কোচ রাজার রাজ্য কোচবিহার ব্রিটিশ আমলেও একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল

কোচ বিহার প্রিন্সলি স্টেট হিসেবে তথাকথিত স্বাধীনভাবে ইংরেজ আমলটিও পার করেতে পেরেছিলকোচ রাজাগণ এবং রংপুরের মহারাজাগণ মূলত ছিল সামন্ততাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, ছিল ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে মহলের বিনিময়বলা হয়ে থাকে, সেই মোগল আমলে প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই ক্ষুদ্র রাজ্যের রাজা ও মহারাজারা মিলিত হতো তিস্তার পাড়ে দাবা ও তাস খেলার উদ্দেশ্যেখেলায় বাজি ধরা হতো বিভিন্ন মহলকে যা কাগজের টুকরা দিয়ে চিহ্নিত করা হতোখেলায় হারজিতের মধ্য দিয়ে এই কাগজের টুকরা বা ছিট বিনিময় হতোসাথে সাথে বদলাতো সংশ্লিষ্ট মহলের মালিকানাএভাবেই নাকি সেই আমলে তৈরি হয়েছিল একের রাজ্যের ভেতরে অন্যের ছিট মহল

আজকের ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের সমস্ত ভূমি ব্রিটিশ রাজের অন্তর্গত ছিল নাপ্রায় ৪০ শতাংশ ছিল বিভিন্ন তথাকথিতস্বাধীন রাজ্যযেগুলিকে বলা হতোনেটিভ স্টেটবাপ্রিন্সলি স্টেটএ রাজ্যগুলি কার্যত ছিল ব্রিটিশদের অধীন তবে অভ্যন্তরীণ বিষয়াদিতে রাজাদের কর্তৃত্ব বজায় ছিলহায়দ্রাবাদের নিজামের মত কোচ রাজাও ব্রিটিশদের নেটিভ স্টেট-এর রাজা হিসেবে থেকে যানভারত ভাগের সময় এরূপ রাজ্যগুলিকে স্বাধীনতা দেয়া বা ভাগ করার এখতিয়ার ব্রিটিশ রাজের ছিল না

১৯৪৭ সালে ১৫ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টইন্ডিয়ান ইন্ডিপেন্ডেন্স এক্ট-১৯৪৭পাশ করেএ আইন অনুসরণ করে সেই বছরেই ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ রাজ বিলুপ্ত হয় এবং ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র গঠিত হয়প্রণীত আইনে বলা হয়, উপমহাদেশেরস্বাধীনঅঞ্চলগুলোর নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেয়া সুযোগ থাকবে অথবা তারা স্বাধীন সত্তা নিয়েও ইচ্ছে করলে থাকতে পারবেরাঙামাটির রামগড় ও বান্দরবান পূর্ব পাকিস্তানের সাথে এবং পূর্ব সীমান্তের পার্বত্য ত্রিপুরা ও উত্তরের কোচ বিহার ভারতের সাথে যুক্ত হয়

অন্য কোন রাজ্যে জমি নিয়ে সমস্যা না ঘটলেও সমস্যা বাঁধে কুচবিহারেতখনকার কোচ রাজা জগদ্দীপেন্দ্র নারায়ণের কিছু জমিদারি স্বত্ব ছিল বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার মধ্যেএকইভাবে রংপুর ও দিনাজপুরের জমিদারের কিছু তালুক ছিল কুচবিহার সীমানার ভেতরএ নিয়ে জমিদারদ্বয় কোন সমঝোতায় আসতে ব্যর্থ হন

১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের উদ্দেশ্যে সীমানা নির্ধারণকল্পে সিরিল রেডক্লিফকে সভাপতি করে কমিশন গঠন করা হয়তিনি ছিলেন একজন আইনবেত্তা মাত্র, দেশের সীমানা নির্ধারণের মত কাজে তার কোন জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা ছিল নাকমিশনের অন্য সদস্যদেরও একই হাল ছিলকিন্তু যুদ্ধ বিধ্বস্ত ব্রিটিশ সরকারের না ছিল উদ্যম, না ছিল তার হাতে সময়

১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই ভারতে ভারতে আসেন এবং মাত্র ছয় সপ্তাহের কাজ করে ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেনকমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব ও স্থানীয় রাজনীতিবিদদের দ্বারা দেশের সীমারেখা নির্ধারণ প্রভাবিত হয়েছেকমিশন কোচ বিহার ও রংপুর এলাকার ছিটমহলগুলো নিয়ে কোন সমাধানে আসতে পারেনি এবং ছিটমহলগুলো বজায় রাখেএভাবে রেডক্লিফের অংকিত ম্যাপ অনুসারেই শেষ পর্যন্ত ভারত ভাগ হয় ও ছিট মহলগুলো থেকে যায়
তথ্যসূত্রঃ এই পোস্টটি তৈরি করতে উইকিপিডিয়া ও কয়েকটি বাংলা ব্লগের সাহায্য নেওয়া হয়েছে


শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা সিনেমার তালিকা



মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বাংলা সিনেমার তালিকা।

১৯৭০-এর দশকঃ

১.জীবন থেকে নেওয়া (১৯৭১) — জহির রায়হান পরিচালিত
২.ওরা ১১ জন (১৯৭২) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
৩.বাঘা বাঙ্গালী (১৯৭২) — আনন্দ পরিচালিত
৪.জয় বাংলা (১৯৭২) — ফকরুল আলম পরিচালিত
৫.অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী (১৯৭২) — সুভাষ দত্ত পরিচালিত
৬.ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩) — আলমগীর কবির পরিচালিত
৭.আমার জন্মভূমি (১৯৭৩) — আলমগীর কুমকুম পরিচালিত
৮.সংগ্রাম (১৯৭৩) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
৯.আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩) — খান আতাউর রহমান
১০.আলোর মিছিল (১৯৭৪) — নারয়ণ ঘোষ মিতা পরিচালিত
১১.বাংলার ২৪ বছর (১৯৭৪) — মোহাম্মদ আলী পরিচালিত
১২.কার হাসি কে হাসে (১৯৭৪) — আনন্দ পরিচালিত
১৩.মেঘের অনেক রঙ (১৯৭৬) — হারুন-উর-রশিদ পরিচালিত


১৯৮০-এর দশকঃ

১৪.বাঁধন হারা (১৯৮১) — এ. জে. মিন্টু পরিচালিত
১৫.কলমীলতা (১৯৮১) — শহীদুল হক খান পরিচালিত
১৬.চিৎকার (১৯৮১) — মতিন রহমান পরিচালিত

১৯৯০-এর দশকঃ

১৭.একাত্তরের যীশু (১৯৯৩) — নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু পরিচালিত
১৮.নদীর নাম মধুমতি (১৯৯৪) — তানভীর মোকাম্মেল পরিচালিত
১৯.আগুনের পরশমণি (১৯৯৫) — হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত
২০.মুক্তির গান (১৯৯৫) — তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত
২১.হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড (১৯৯৭) — চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত
২২.মুক্তির কথা (১৯৯৯) — তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ পরিচালিত

২০০০-এর দশকঃ

২৩.মাটির ময়না (২০০২) — তারেক মাসুদ পরিচালিত
২৪.জয়যাত্রা (২০০৪) — তৌকির আহমেদ পরিচালিত
২৫.শ্যামল ছায়া (২০০৪) — হুমায়ুন আহমেদ পরিচালিত
২৬.খেলাঘর (২০০৬) — মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত

২০১০-এর দশকঃ

২৭.আমার বন্ধু রাশেদ - মোরশেদুল ইসলাম পরিচালিত
২৮ গেরিলা (চলচ্চিত্র) - নাসিরুদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত

আরো আছেঃ এখনো অনেক রাত, মেঘের পর মেঘ ,হৃদয়ে আমার দেশ, হৃদয়ে'৭১, সংগ্রাম, ৭১ এর গেরিলা ও আরো নাম না জানা অনেক।

এটি কোন চূড়ান্ত তালিকা নয়। আপনার জানা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোন চলচ্চিত্রের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ে থাকলে দয়া করে মন্তব্যের ঘরে সেই সিনেমার নামটা উল্লেখ করে দিন। আমি পোস্টটা আপডেট করে নেব।

তথ্যসূত্রঃ বাংলা চলচ্চিত্র গ্রুপ

বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৪

কল্পনা নয় বাস্তবের শার্লক হোমস

জেমস বন্ডের মতো কালজয়ী আরেকটি গোয়েন্দা চরিত্র শার্লক হোমস। শত বছর ধরে পাঠক হৃদয়ে যার সপ্রতিভ অবস্থান। মজার ব্যাপার হচ্ছে জেমস বন্ডের মতো এই শার্লক হোমস চরিত্রও বাস্তবের এক ব্যক্তিকে অবলম্বন করে রূপায়িত। তবে চলুন এখন জানি, কে সেই বাস্তবের শার্লক হোমস!

১৮৮৬ সালের মার্চ মাস। প্লাইমাউথের বুশ ভিলাতে ডাক্তারির পাশাপাশি গোয়েন্দা কাহিনী লিখায় হাত দেন আর্থার কোনান ডয়েল। ১৮৮৭ সালে A Tangled Skin উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি শার্লক হোমসের সৃষ্টি করেন। প্রথম দিকে শার্লকের নাম রাখা হয়েছিলো শেরিনফোর্ড হোমস। কিন্তু এই নাম পছন্দমতো না হওয়ায় বদলে রাখলেন শার্লক হোমস। সেই সাথে উপন্যাসের নাম বদলে রাখলেন ‘এ্যা স্টাডি ইন স্কারলেট’। একসময় ডাক্তারি পেশা ছেড়ে লেখালেখিতে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন।

শিল্পীর চোখে শার্লক হোমস
 উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের নাম ঠিক হলো, কিন্তু তারপরও ডয়েল তীব্র উৎকন্ঠায় ভুগছেন। তার মনে শংকা ছিলো তিনি কি কাহিনীটাকে এগিয়ে নিতে পারবেন! তিনি এমন এক গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করতে চান যা তখনকার জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র দুপ্যাঁকেও বুদ্ধিতে ছাড়িয়ে যায়। ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো ডক্টর বেলের কথা।

১৮৭০ সালে কোনান ডয়েল এডিনবরা মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। সে সময় ডক্টর যোসেফ বেল এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও এডিনবরা মেডিক্যাল জার্নালের সম্পাদক। এডিনবরা গোলন্দাজ বাহিনীর তিনিই তখন উপদেষ্টা চিকিৎসক। কোনান ডয়েল নিজেই বলেছেন, “শার্লক হোমস চরিত্র সৃষ্টি করতে গিয়ে আমি বারবার তার কথাই ভাবছিলাম। আমার পুরনো শিক্ষক যোসেফ বেল। তাঁর ঈগল পাখির মতো চোখ-মুখ, কৌতূহলোদ্দীপক চলাফেরা, যেকোন ব্যাপারে তাঁর গভীর চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধানের অদ্ভুত ক্ষমতা…এ সবই আমার বারবার মনে পড়ছিলো।”

এডিনবরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে কোনান ডয়েল, ডক্টর বেলের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন, রোগীদের কেস হিস্ট্রি লিখতেন। তখন ডয়েল, বেলের ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে থেকে তার বিভিন্ন কর্মকান্ড স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন। একবার একজন রোগীকে দেখেই বেল বলে দিয়েছিলেন, “ভদ্রলোক হাইল্যান্ড রেজিমেন্টে একজন নন-কমিশনড অফিসার ছিলেন। বার্বাডোজে কিছুদিন কাটিয়ে এসেছেন।”

উপস্থিত হতভম্ব ছাত্রদের সামনে ডক্টর বেল ঘটনাটির ব্যাখ্যাও দিয়েছিলেন এভাবে, “ ভদ্রলোকের চেহারা, আচার-আচরণ বেশ সম্ভ্রান্ত কিন্তু উনি মাথা থেকে টুপি খোলেননি। সেনাবাহিনীর লোকেরা টুপি না খোলায় অভ্যস্ত। ভদ্রলোক নিশ্চয় কয়েকদিন আগে অবসর নিয়েছেন, তা না হলে তিনি এই সাধারণ ভব্যতায় অভ্যস্ত হতেন। ভদ্রলোক অন্যের উপর কর্তৃত্ব ফলাতে ভালোবাসেন, স্কটল্যান্ডের লোকের এ রকম অভ্যাস থাকে। ভদ্রলোকের গোদ রোগ হয়েছে, ওটা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের রোগ, ব্রিটেনের নয়। ভদ্রলোক যে বার্বাডোজে ছিলেন, এটাই তার সবচেয়ে বড়প্রমাণ।”

 উপরের ব্যাখ্যা থেকেই বুঝা যায় ডক্টর বেল কতোটা তীক্ষ বুদ্ধির অধিকারী ছিলেন। আর তার সেই বুদ্ধিমত্তায় বেশী আকৃষ্ট হয়েছিলেন কোনান ডয়েল। তাইতো শার্লক হোমস চরিত্র অলংকরণ করতে গিয়ে বারবার বেলের কথা মনে হয়েছে তার। ১৮৯২ সালের ৪মে কোনান ডয়েল এক চিঠিতে ডক্টর বেলকে লিখেছিলেন, “এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে, আপনাকে দেখেই আমি শার্লক হোমস এর চরিত্র সৃষ্টি করেছি। শার্লক হোমসের বিশ্লেষণী ক্ষমতা কোনও বানানো অতিরঞ্জিত ব্যাপার নয়। এডিনবরা হাসপাতালের বহির্বিভাগে আমি নিজে আপনাকে ওই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে দেখেছি।”

ছাত্রের এ গুরুদক্ষিণায় ডক্টর বেল অবশ্যই খুশি হয়েছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে শার্লক হোমসের উৎস সম্বন্ধে অন্য ধারণা পোষণ করতেন। এক চিঠিতে তিনি ডয়েলকে লিখেছিলেন, “আমারতো মনে হয় তুমিই শার্লক হোমস। আর তুমি সেটা ভালো করেই জানো।”

আর্থার কোনান ডয়েল, শার্লক হোমসকে নিয়ে চারটি উপন্যাস ও ছাপ্পান্নটি ছোটোগল্প লিখেছেন। ১ম কাহিনী ‘এ স্টাডি ইন স্কারলেট’ ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হয়। ২য় কাহিনী ‘দ্য সাইন অব দা ফোর’ ১৮৯০ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮৯১ সালে দ্য স্ট্যান্ড ম্যাগাজিন পত্রিকায় প্রথম ছোটগল্পের সিরিজটি প্রকাশিত হওয়ার পরই শার্লক হোমস চরিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত হোমসকে নিয়ে একগুচ্ছ ছোটগল্পের সিরিজ ও আরও দুটি ধারাবাহিক উপন্যাস প্রকাশিত হয়। হোমস কাহিনীর পটভূমির সময়কাল ১৮৮০ থেকে ১৯০৭ সাল। শেষ ঘটনাটির সময়কাল অবশ্য ১৯১৪।

আর্থার কোনান ডোয়েল
 শার্লক হোমস চরিত্র এতোটাই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো যে দিনদিন এর নতুন কাহিনীর পাঠক চাহিদা বেড়েই চলেছিলো। এক চরিত্রকে নিয়ে বারবার লিখতে লিখতে কোনান ডয়েল বিরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। তাছাড়া গোয়েন্দা কাহিনী লিখতে গেলে প্রয়োজন গভীর চিন্তাভাবনার। তাই শেষদিকে তিনি শার্লক হোমসকে নিয়ে লেখা বন্ধ করে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পাঠক চাহিদার কাছে তিনি হার মেনেছিলেন। কোনান ডয়েলের মৃত্যুর পরও শার্লক হোমসকে নিয়ে অনেক কাহিনী লিখা হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষায় নির্মিত হয়েছে অজস্র চলচিত্র।

আজও বিশ্বের রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষের কাছে শার্লক হোমস সত্যিকারের এক জীবন্ত চরিত্র। শার্লক হোমস যে একটা কাল্পনিক চরিত্র, একথা আজও অনেকেই বিশ্বাস করতে চাননা। এখনও তার নামে ২২১/বি, বেকার স্ট্রিটের ঠিকানায় সপ্তাহে গড়ে ৫০-৬০ খানা চিঠি আসে । গল্পের চিঠিগুলোর উত্তর দিতেন তার সহকারী বন্ধু ওয়াটসন। কিন্তু এখন ওয়াটসন না থাকলেও উত্তর দেওয়া হয় ‘হোমস সোসাইটি’ এর পক্ষ থেকে । সবাইকে জানানো হয়, আমরা দুঃখিত! শার্লক হোমস এখন গোয়েন্দাগিরি করছেন না, তিনি তার পেশা ছেড়ে মৌমাছি পালনে ব্যস্ত। সত্যিই এ এক অদ্ভুত ব্যাপার।

কি পাঠাবেন নাকি আপনিও একটি চিঠি! বলা যায়না গল্পের শার্লক হোমস বাস্তবে উত্তর দিয়ে দিতে পারেন!!!

Copyright © 2014 রিপন ঘোষের খেরোখাতা All Right Reserved
^
Blogger দ্বারা পরিচালিত.